ফুলির জন্য — শিক্ষণীয় বাস্তব গল্প

রোদের মধ্যে ঘাম মুছতে গিয়ে চোখের পানিও মুছলো সজল। পাজামার ছেড়া পকেটে রাখা খুচরো টাকাগুলো গুনতে ইচ্ছে করছে না ওর। আসলে সাহস নেই টাকাগুলো গুনে দেখবার। পায়ের দিকে নজর যায় সজলের। ছেড়া স্যান্ডেলখানা সে আর মুচির থেকে সেলাই করেও পরতে পারবে না ভেবে বুকের ভেতরটা কেমন ধীরে ওঠানামা করতে শুরু করলো ওর। 

রাস্তায় জাদু দেখানোর জন্য সজলের অনেক চেনাজানা আছে। যাদু দেখানোর সময় লোকের মুখের হাসি তার বড় ভালো লাগে। কিন্তু লোকের হাসি অর্জন করে তো ভাত হবে না। সজল নিজ অজান্তেই ক্ষুধার্ত পেটে হাত বুলায়। 

“আম্রে যাদু শিখাইবা?”

সজল নির্লিপ্ত মুখে তাকালো। একটা সাত বছরের মেয়ে দাঁড়িয়ে ওর সামনে। সজল বলল, “তুই কে?”
মেয়েটি সে কথার জবাব না দিয়ে মিষ্টি মিষ্টি হেসে সজলের দিকে তাকিয়ে রইলো। সজল বলল, “বাড়ি কনে তোর?”
“তোমায় ক্যান কবো?”
“কইবি না যখন তখন থাউক।”

বলতে বলতে সজল একটা কয়েন বার করে। বলে, “এই যাদুখানা কি শিখতে চাস?”
সজল কয়েনটা এ হাত ও হাত করতে করতে কখন যেন অদৃশ্য করে ফেলে। মেয়েটা বলে, “এইডা তো দ্যাখছি।”
“তাইলে পুতুলের যাদু?”
“এইডাও দ্যাখছি।”
“কার্ডের ম্যাজিক?”
“দ্যাখছি ইডাও!” মেয়েটি একরকম বিরক্ত হয়েই জবাব দেয়।

সজল হতাশ গলায় বলে, “তাইলে তুই নিজেই ক দেহি, কি ম্যাজিক শিখবার চাস?”
মেয়েটি চট করে জবাব দেয়, “খিদা না লাগনের যাদু শিখাও!”


সজল একইসাথে চমকে যায় এবং অভিভূত হয়ে যায়। সে আরেক নজর মেয়েটিকে দেখে গম্ভীর গলায় বলে, “তরে কি কেউ এই কথা শিখাই দিছে মজা নেওনের লাগি? এমন জটিল কথা জীবনেও শুনি নাই!”
মেয়েটি জবাবে অন্য উত্তর দিলো, বলল, “আমার নাম তুলি।”
“ম্যালা সোন্দর নাম!”

এসময় কেউ একজন ছুটে এসে বলে, “অয় ফুলি, তরে না কইছি ত্যক্ত রোইদে না ঘুরতে!”
সজল বলল, “অর নাম ফুলি? আম্রে কয় তুলি।”

বলেই সজল ফিক করে হাসে। লোকটা বিরক্ত হয়ে বলে, “তুমি থামো মিয়া! আর জায়গা পাও নাই, বাড়িত কাছ ঘাইষ্যা বইসে রইছো।”

ইতিমধ্যে লোকটি ফুলির হাত ধরে বাড়ি নিতে চাইলেন, কিন্তু ফুলিও ততক্ষণে জেদ ধরেছে। বলে, “বাপজান, অয় ভালো যাদু জানে। আমগো উপকার হইবো।”

ফুলির বাবা এবার আরও বিরক্তি ও রাগ নিয়ে সজলকে বলল, “অয়, তুই এরে কি মন্ত্র পড়াইছস?”
সজল বলে, “আম্রে তুই তুকারি করেন ক্যান?”

ফুলির বাবা জবাব না দিয়ে ফুলিকে নিয়ে চলে যায়। সজলের কেন জানি মন খারাপ লাগে, বাচ্চা মেয়েটা তাকে বিশ্বাস করে কিছু চাইছিল। কিন্তু সে তা দিতে অপারগ। সে শুধু চেয়ে রইলো ফুলির যাওয়ার দিকে। তপ্ত রোদের পিচঢালা রাস্তায় মেয়েটি পা ফেলে চলেছে। এটা ঠিক না – পায়ে ফোসকা পড়তে পারে। সজলের মন আরও খারাপ হয়ে গেল। 


সজল কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। রোদের তাপ যেন আরও বেড়ে গেছে। কিন্তু তার ভেতরের চিন্তাগুলো আরও গরম হয়ে উঠছে। "খিদা না লাগনের যাদু শিখাও!" — ফুলির কথাটা ওর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। নিজের কষ্ট ভুলে গিয়ে সেই ছোট্ট মেয়েটার জন্য মনটা হাহাকার করে উঠলো।
হঠাৎই সজল নিজের পকেট থেকে সব খুচরো টাকা বের করে হাতে নিলো। ঠিক কত আছে গুনে দেখার সাহস ছিল না আগে, কিন্তু এখন আর সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। টাকা হাতে নিয়েই ছুটতে শুরু করলো ফুলিদের দিকের পথ ধরে।
দূর থেকে দেখতে পেলো, ফুলি আর তার বাবা ধীরে ধীরে রোদ পোহাতে পোহাতে হেঁটে যাচ্ছে। সজল হাঁপাতে হাঁপাতে গিয়ে ওদের সামনে দাঁড়ালো। ফুলির বাবা রাগত চোখে তাকালো, কিন্তু সজল কোনো কথা বললো না। চুপচাপ হাতে থাকা খুচরো টাকাগুলো এগিয়ে দিয়ে বললো, "এই টুকু দিয়া একটু কিছু কিনে দাও ফুলির জন্য। বেশি না, এক বেলা অন্তত খিদা মিটুক।"
ফুলির বাবা প্রথমে কিছুটা বিরক্ত থাকলেও, সজলের চোখের ভেতরের সৎ চাহিদা বুঝতে পারলো। তিনি নীরবে টাকা নিলেন। ফুলি খুশি হয়ে বললো, "তুমি তো সত্যিই ভালো যাদু জানো! এখন আমার খিদা কমবে।"
সজল একচোট হেসে বললো, "এইডা কোনো যাদু না, তুলি... মানে ফুলি। মানুষ মানুষরে সাহায্য করলেই সব চেয়ে বড় যাদু হয়।"
ফুলি মিষ্টি হেসে ওর দিকে তাকাল। সজল ধীরে ধীরে ফিরে চললো, পায়ের ক্ষতবিক্ষত স্যান্ডেলটা টেনে নিয়ে। পকেট ফাঁকা হলেও তার বুকটা যেন হালকা হয়ে গেল।
সজল মনে মনে ভাবলো, “যাদু মানে চোখের ভুল দেখানো নয়, যাদু মানে কারো জীবনে ছোট্ট একটু ভালো লাগা এনে দেওয়া।”

Previous Post Next Post