যাপন — অচেনা দুঃখের গল্প

খুব কাছ থেকে কেউ ব্যর্থতা মেনে নিয়ে জীবনকে অভিশাপ দিয়ে ছুটে গেল। আমি সেই মানুষটাকে চিনি — আমাদের অফিসের ম্যানেজার। টাকার অভাবে তার সন্তানের চিকিৎসা হয়নি। ডাক্তাররা কেমোথেরাপির আশা ছেড়ে দিতে বলেছেন। সবিস্তরে জানিয়েছেন অনেক দেরি হয়ে গেছে। 

সেই মানুষটা চোখ মুছতে মুছতে রোজ অফিস আসছেন। আমরা তাকে দেখে স্বান্তনার চোখ বুলিয়ে যাচ্ছি কেবল। মোবারক ভাই নির্বিরোধী মানুষ। কারও সাথে মিশেন পর্যন্ত না। কাছে গেলে বলেন, শান্তিপ্রিয় মানুষ আমি। 

অথচ রাত দিন মিলিয়ে সবসময়ই পরিশ্রম করে চলেন৷ আমাকে কেন জানি খুব স্নেহ করেন। বয়সে অনেক ছোট বলেই কি? তিনি বলেন, বুঝলে আহাদ, সারাদিন খেটেখুটে যখন রাতে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিই মনে হয় এই শান্তির কাছে জীবনের সমস্ত কঠিন পরিস্থিতি পরাজিত। 

কথাগুলো আমার কাছে আধ্যাত্মিক লাগে, মর্ম উদ্ধারের চেষ্টা তাই নিছক বিলাসীতা। অফিসের সাথে সাথে সিগারেটের ছাইয়ে কফির ঘ্রাণেই আমার ছোট্ট জীবন। বিয়ে করিনি, সংসারকেও তাই বড্ড ভয় পাই। আসলে আমি মানুষটা খুব স্বার্থপর। সবসময় নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পছন্দ করি। পরিস্থিতি তাই আমাকে ঈর্ষা করে। কারণ স্বার্থপরেরাই পরিস্থিতি এড়িয়ে চলে। জীবন কিন্তু স্বার্থপরদেরকেও পাকড়াও করে। অপেক্ষা শুধু সময়ের, আমার স্বার্থপরতার দিন অচিরেই ঘনিয়ে আসবে…

 

অতঃপর দুর্বল কন্ঠে সময়টা গেয়ে চলেছে অদূর ভবিষ্যৎ ধারণের গান। ভবিষ্যৎ একটা অনিশ্চয়তার নাম মাত্র। যেটা মানুষকে বুঝিয়ে দেয় কোনোকিছুই মানুষের হাতে নেই। মানুষ কেবল কিছু একটা শুরু করতে পারে। শেষটা কখনোই তার হাতে থাকে না। কারণ সৃষ্টির সেরা জীব হলেও স্বয়ংসম্পূর্ণ তো একজনই। যার কাছে সকল সমর্পণের দাবী।

ডেস্কে ঠাস করে পেটমোটা ফাইল রেখে গেল কেউ। আমি ক্রস চেকিংয়ের হিসাব মিলিয়ে ভুল বার করি। ক্যাশ সেকশনে ছুড়ে দিয়ে বলি, দবির, আরেকটু সতর্ক হও মিয়া!

দবির আতংক নিয়ে তাকায়। মায়া হয় আমারও। এমন করে না বললেও পারতাম৷ আসলে জীবনের ওপর বিরক্ত আমি।  সবকিছু এত ফিকে আর সংকীর্ণ মনে হয় আজকাল, যেন আরেকটা বিগ ব্যাং মানব সম্প্রদায়ে জরুরি।  বিক্ষিপ্ত জীবনের শেষ কোথায়?

আরও পড়ুন : দ্য ডেমোনিক আওয়ার — ভয়ংকর ভুতের গল্প

এই সময়েই ঘটনাটা ঘটলো। 

“মিথ্যে! জীবন মিথ্যে! জীবন বলে কিছু নেই। সবই জুয়া। সব জুয়া!”

আমি দাঁড়িয়ে পড়ি। আস্তে আস্তে অনেকগুলো ডেস্কের ওপর থেকে উঁকি দেয় কলিগেরা। মোবারক ভাইয়ের চিৎকার থামে না। তাকে দেখে মায়া হয় আমার। আমি ছুটে গিয়ে মোবারক ভাইকে স্পর্শ করতে যাই। নাগাল পাই না। 

তিনি তেতলার অফিসের সিঁড়িভেঙে নামেন। দ্রুতই নামেন। পিছু নিলে তাকে আবিষ্কার করি কংক্রিটের মেঝেতে হাঁটুগেড়ে বসে থাকা অবস্থায়। মাঝবয়েসী লোকটা অঝোরে কাঁদছেন। তাকে ঘিরে কতিপয় পথচারীর ভীড়। কৌতূহলী সেইসব চোখের মাঝে মিলিয়ে দেখি সবার চোখে কী নিদারুণ সহানুভূতি! আহা, জীবনের মায়া বুঝি এমনই। জগৎ অদৃশ্য রহস্য খেলে তবু কিছু রহস্য যেন বুঝেও অধরা রয়ে যায়। 

পৃথিবীর সবাই একইভাবে কাঁদে একইভাবে হাসে। ক্ষুধার রাজ্যেও মানুষ পশু এক কাতারে আমরা সবাই। ছোট এই একঘেয়ে একটা জীবন, তবু এর মাঝেই কত না বৈচিত্র‍্য!

Previous Post Next Post