এক.
হিমেলের সাথে বহুদিন পর দেখা হলো। আমি তাকে এড়িয়ে যেতে চাইলাম, ভয় হতে লাগলো কখন না জানি সে প্রেমার প্রসঙ্গে কথা শুরু করে। আর হিমেল গাধাটা সেটাই করলো, চোখমুখ অপ্রসন্ন করে বলে, “প্রেমার সাথে আমার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে।”
আমি গম্ভীর গলায় বললাম, “জানি।”
“তুই কীভাবে জানবি?” হিমেল আঁতকে ওঠে, “প্রেমার সাথে তোর তো কোনো যোগাযোগ নেই।”
“হুম।”
হিমেল হতাশার শব্দ করলো— সে জানে একবার আমি ‘হুম’ বললে কথা আর এগোয় না। আমিই নিজ থেকে বললাম, “প্রেমার পেছনে আমি লোক লাগিয়ে ছিলাম। সে-ই টুয়েন্টি ফোর সেভেন আমাকে আপডেট জানাতো।”
হিমেল আশ্চর্য হলো না। কিছুক্ষণ কী ভেবে বলল, “প্রেমা চলে গিয়ে ভালোই হয়েছে। এখন আর তাকে হারানোর ভয় নেই। যতদিন ছিল, শুধু মনে হতো— এত রূপবতী মেয়েকে না জানি কে আমার থেকে ছিনিয়ে নেয়।”
আমি কিছু বলি না, তবে আরও গম্ভীর হয়ে যাই।
হিমেল নড়ছে না। চুপ করে বসে আছে আমার সামনে। ফাস্টফুড অর্ডার করে আমিও বসে আছি এক স্ট্রিট ফুড রেস্টুরেন্টে। হিমেল হঠাৎ সিগারেট ধরিয়েছে৷ ওর চোখেমুখে বিষণ্ণতা নেই। কিন্তু আচরণে অস্থিরতা।
আমার সাথেও একসময় প্রেমার সম্পর্ক ছিল। আমি মিরপুর এক নম্বর রোডে একটি মেসবাড়িতে থাকি। হিমেল প্রায়ই আমার মেসবাড়িতে আসতো। একদিন আমি ছিলাম না, মেসের ঘরে প্রেমা ছিল। আমি এসে দেখি— হিমেল আচ্ছন্নের মতো প্রেমাকে দেখছে।
তারপর অন্য আরেকদিন বৃষ্টিভেজা বাস ছাউনিতে প্রেমার সাথে আমার দেখা। আমি অফিস ফেরত হয়ে বাস থেকে সবে নেমেছি তখন। প্রেমা বলল, “হিমেল ছেলেটা খুব আকর্ষণীয়। ওর সাথে কিস করার সময় হঠাৎ সে ছেড়ে দেয় না। খুব ফিল হয় মুহূর্তটা।”
বৃষ্টি তখন বেড়েছে। আমি রিকশা পাব না জেনেও দাঁড়িয়ে আছি। প্রেমাকে বললাম, “আজ বৃষ্টিতে ভিজব। তুমি কি সঙ্গ দেবে?”
“না,” প্রেমা আবারও হিমেলকে নিয়ে বলল, “তোমার বন্ধুটা গায়ে পড়া স্বভাবের। বিয়ের পর ওকে আমি গাইড করব।”
আরও পড়ুন : নিঃশব্দের প্রয়োজনে — ভিন্ন প্রেমের গল্প
আশ্চর্য, বিয়েটা সত্যিই হয়ে গেল! আশ্চর্যের ব্যাপার এ কারণেই যে, প্রেমার সাথে আরও অনেকের সম্পর্ক ছিল। কিন্তু কাউকে সে বিয়ে করেনি। প্রেমার বিয়েতে আমি গিয়েছিলাম। ওর পাশে বসে বলেছিলাম, “স্বাধীন জীবন ছেড়ে হঠাৎ বিয়েতে জড়ালে কেন?”
প্রেমা শব্দ করে হাসলো। হেসেই যেতে থাকলো। আর বলল, “আমি জানতাম তুমি এই প্রশ্নটিই কোনো একদিন আমায় করবে।”
আমিও উত্তর জানার আশায় উৎসুক চোখে তাকালাম। প্রেমা বলল, “হিমেল ভালো কিস করতে পারে। এই কারণটা কি যথেষ্ট নয়?”
আমি হাল ছেড়ে দিলাম— উত্তর পাব না জানি।
দুই.
আমাদের তিনজনের শহরটা ছোট, কিন্তু বিরক্তিকরও। এখানে নাইট ক্লাব নেই, রেস্টুরেন্টও রাত দশটার পর খোলা থাকে না। পথঘাট এত চিকন যে, হাঁটতে বেরিয়ে সহজ হতে পারি না। তবু আজ পথে বেরিয়েছি।
নির্জন গলিপথে হাঁটছি, সন্ধ্যা সন্ধ্যা ভাব আকাশে।
হঠাৎ কেউ নাম ধরে ডাকলো, “এই নীল?”
পেছন তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেলাম না। ডাক দিয়েই কেউ লুকিয়ে পড়েছে— এমনও মনে হলো না। সবথেকে করুণ যে বিষয়টি তা হলো— কন্ঠস্বরটা প্রেমার।
আমি প্রেমাকে ভুলতে চাই। প্রেমা সম্পর্কিত সবকিছুই ভুলতে চাই। কেন ভুলতে চাই নিজেও জানি না। তার সাথে আমার প্রেম ছিল না। মাঝে মধ্যে আমরা শারীরিক সম্পর্কে জড়াতাম, সেটাও খুব ক্যাজুয়ালি। তাহলে তাকে নিয়ে এখন এত ভাবনা কেন?
আমি অজান্তেই দাঁড়িয়ে পড়েছি। আমার মন বলছে গলির কোনো এক জায়গা থেকে প্রেমা বেরিয়ে আসবে। আর আমার এটাও মনে হলো— প্রেমার জন্য আমি এখানে সারাজীবন অপেক্ষা করতে পারি।
কিন্তু প্রেমার দেখা মিললো না।
হিমেলের সাথে আজকাল প্রায়ই দেখা হচ্ছে। সে-ই আগবাড়িয়ে দেখা করে, কথা বলে। বন্ধুত্বের খাতিরে অনেক আন্তরিকতা দেখায়। আমি পাত্তা দিই না।
আরও পড়ুন : যাপন — অচেনা দুঃখের গল্প
তবে হিমেলের কিছু বিষয় আমাকে ভাবালো। ছেলেটা ভালো কবিতা লিখে। আমি এতদিন এটা জানতাম না। সে আমার নাম ধরে বলল, “জানিস নীল, ছোটবেলায় একটা মেয়ে আমাকে কুৎসিত বলেছিল। আর হাইস্কুলে কিস করতে চাওয়ায় আরও এক মেয়ে সরাসরি আমায় থাপ্পড় মেরেছিল। কিন্তু আজ অবধি যত মেয়েকে কিস করেছি সবাই বলে, আমার কাছে ইমরান হাশমি ডালভাত।”
এসব বলে সে খুবই আরাম পায়। আরামে সিগারেট ধরিয়ে বসে। হিমেল আগে এত সিগারেট খেত না।
সে আমাকে চুপ থাকতে দেখে অপ্রসন্ন হয় না। বরং বলে চলে মনের যত কথা। সেদিন বলছিল, “প্রেমাকে আমি কখনও আমার ভালোবাসা বুঝতে দিতে চাইনি। কারণ বেশি ভালোবাসা পেলে মেয়েরা থাকে না। তারা অ্যাটেনশন চায় শুধু। সেটা না পেলে আদায়ের চেষ্টা করে। আর সেই চেষ্টার মাঝেই জন্মায় ভালোবাসা।”
একটু থেমে হিমেল কেঁদে ফেলে। বলে, “সে আমার অ্যাটেনশন পাবার চেষ্টা করেনি। তার আগেই চলে গেছে।”
হিমেল এটা বলে আমার মেসবাড়ি থেকে চলে যায়। এরপর আর কোনোদিন আসেনি। আমিও ওকে আর খুঁজিনি। প্রেমাকেও খুঁজিনি।
তিন.
“স্যার, আপনার প্রচুর পেন্ডিং কাজ জমা হয়ে আছে। আপনি কি সেগুলো আমাকে দিয়ে করাতে চান?”
ফোনের অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসা কন্ঠস্বরটি আমার চেনা। তার নাম টক্সিক ব্লাড— অদ্ভুত ছদ্মনামের এই মানুষটি আমার কথায় প্রেমার ইনফো আমার কাছে এনে দেয়।
এতদিনে আমি তার মাধ্যমে জেনেছি প্রেমা এখন কোথায় থাকে, তার বৈবাহিক অবস্থা কী।
টক্সিক ব্লাড আমার থেকে সাড়া না পেয়ে বলে, “স্যার, আপনার কাজটি আমি আগেও প্রফেশনালি করেছি এখনও তাই করব। আমার অ্যাপ্রোচে কোনো ত্রুটি থাকবে না।”
“কত টাকা পেন্ডিং হয়েছে বলো,” আমি জানি সে প্রফেশনের খাতিরে সরাসরি টাকার কথা বলতে পারছে না, “তোমাকে একবারেই পে করে দিচ্ছি উইথ টিপস।”
আরও পড়ুন : নীল আকাশের ব্যপ্তি — গভীর ভালোবাসার গল্প
“সরি স্যার!”
“তোমাকে আমার আর প্রয়োজন নেই টক্সিক।”
“ভেরি স্যাড টু হিয়ার—”
আমি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলি, “তুমি লাস্ট একটা কাজ করো। তারপর তোমার ব্যাংকে টিপসসহ পেমেন্ট যাবে।”
আগেই বলেছি শহরটা ছোট। তবু এই ছোট শহরে আজকাল হিমেলকে আর খুঁজে পাই না। হঠাৎ করে তাকে কেন খুঁজছি সেটা নিজেও জানি না। জানলে টক্সিক ব্লাডকে বলতাম— হিমেলকে খুঁজতে।
যে গলিপথে প্রেমার কন্ঠস্বর শুনেছিলাম সেখানে আজ আবার এলাম।
টক্সিক ব্লাডকে শেষ কাজ হিসেবে জানিয়েছিলাম— প্রেমাকে এই গলিতে এসে দেখা করতে। প্রেমা সত্যিই এলো। এখন সন্ধ্যা। গলিটা যতটা নির্জন তারচেয়েও অন্ধকার।
প্রেমা বলল, “আমি তো তোমার কেউ না। তাহলে আমাকে এখানে আসতে বললে কেন?”
“তোমাকে একটা কথা বলা হয়নি, তাই।”
“কী কথা?”
“কথাটি খুব সহজ,” আমি অল্প হেসে বলি, “আমি তোমায় ভালোবাসি।”
