একরাশ নীরবতাকে সাক্ষী রেখে হিমি তার পড়ার টেবিলের দিকে তাকিয়ে আছে। আরও সূক্ষ্মভাবে লক্ষ্য করলে বোঝা যায় মেয়েটা টেবিলে থাকা ব্লেডের দিকে তাকিয়ে আছে। তার ভাবনাগুলো এখনও এলোমেলো।
গতসপ্তাহের ঘটনা আজ তার জীবনটাকেই গত করে দিয়ে গেছে। তৈরী হয়েছে বুকে বিশাল ক্ষত। সে এখন যেন জীবিত একটা লাশ.. যাকে মৃত্যুর ঘ্রাণ নিয়ে বাঁচতে হয়। মৃত্যুটাকে লুফে নিতে সে ব্লেডের কার্যপ্রণালী নিয়ে পরিকল্পনায় মগ্ন হল। ব্লেডটা মাখনের মত মোলায়েম হাতটাতে রেখে একটা মাত্র টান........
দরজায় এসময় ধুপধাপ আওয়াজ। চিন্তায় পড়লো ছেদ।
হিমি উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলো। ওপাশে তার বাবা মবিন উদ্দিন দাঁড়িয়ে। তিনি বলেন, "দরজা বন্ধ করেছো কেন?"
হিমি নিশ্চুপ।
"শুনলাম, রাতে খাওনি?"
মবিন উদ্দিনের ভারী গলা শুনে হিমির মৃত্যুর ইচ্ছাটা যেন চিৎকার করে উঠলো। কোথায় যেন দানব আকৃতির কেউ দাঁড়িয়ে বলছে, "হিমি, তুই মরে যা..!"
"কী হল, কথা বলছো না কেন?"
"বাবা, এটা তুমি?"
নিজের অজান্তেই বলল হিমি।
মবিন উদ্দিন রেগে আগুন হলেন। তার ভেতর যেন বাবা সত্তাটি কুম্ভকর্ণ হয়ে ঘুমিয়ে গেছে।
"মেয়ে, আল্লার ওয়াস্তে তুমি আমাদের মুক্তি দাও! যে প্রশ্ন আমাকে করলে সেটা নিজেকে করো। হু আর ইউ? আমরা যে হিমিকে চিনতাম সে কি তুমি?"
চিৎকার-চেচামেচি শুনে হিমির মা ইরা আহমেদ চলে এলেন। হিমগলায় বললেন, "হিমির বাবা, ঘরে যাও।"
মবিন সাহেব বিনাবাক্যব্যয়ে ঘরের দিকে রওনা হলেন। ইরা বললেন তার মেয়েকে, "তুমি জানো তোমার বাবা হার্টের পেশেন্ট। এম্নিতেই তিনি যে শক পেয়েছেন তাতে করে তার বাঁচাটায় মিরাকল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার ওপর তুমি তাকে এত প্রেসার কেন দিচ্ছো?"
হিমির ইচ্ছে হল মায়ের মুখের ওপর দরজা লাগিয়ে দিয়ে মেঝেতে বসে কান্না করে। কিন্তু সে পারলো না। ইরা আহমেদ চলে যাবার পর সে অবশ্য দরজা লাগালো, তবে কাঁদলো না। টেবিলের সামনে বসে ব্লেডের দিকে তাকিয়ে রইলো।
তারপর পাগলের মত ব্লেডের দিকে চেয়ে প্রলাপ বকতে থাকলো, "আমি যাদের বিশ্বাস করতাম তারাই ছিল আমার সর্বোত্তম বন্ধু। যদিও বাবা-মা তাদের সাথে আমাকে ইন্ট্রডিউস করতে দিতো না। বলতো, ওরা খারাপ। ওরা যে খারাপ তা তো আমি বুঝিনি। সেটা বুঝাতেই হয়তো ওরা আমাকে কিডন্যাপ করে নিয়ে যায় একরাতে। হয়তো তাদের খারাপ উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু সেসবের আগেই আমি পালিয়ে এসেছি, ওরা আমায় স্পর্শ পর্যন্ত করতে পারেনি। কিন্তু.... বাবা-মা কেন বিশ্বাস করে না এটা?"
হিমি এবারে সত্যিই কেঁদে ফেললো। কান্নার মাঝেই সে বুঝলো সত্যিই কান্নার মাঝেই মানুষের কষ্টগুলো হালকা করা যায়।
রাত যখন নিশুতি, যখন ঘড়ির রিডিংয়ে তিনের ঘর পার হয়ে গেছে তখন হিমি ঘরে ল্যাপটপের ডিসপ্লের নীল নীল আলো জ্বালিয়ে ফেসবুক ব্রাউজিং করছিলো। তার পাশে তখন কিছু টিস্যু পেপার ছিল, যেগুলো রক্তে ভেজা। একটু আগে ব্লেডটা হাতের ওপর নিয়ে সে একটু টান দিয়েছিল। কব্জি থেকে কিছুটা দূরে, সরাসরি কব্জিতে আঘাত করতে তার সাহস হয়নি। ব্লিডিং হয়েছে বেশ।
নিউজফিডে হঠাৎ একটা পোস্ট পেয়ে সে স্ক্রল
করা থামালো। পোস্টটি ছিল এমন—
"রাত যখন গভীর হয় শয়তানেরা তখন শক্তির দিকে অগ্রসর হয়। আধার তাদের শক্তির উন্মেষ ঘটায়। বিশেষ করে তিনটা থেকে চারটার মধ্যে তাদের শক্তি বৃদ্ধি পায়। এজন্য এই সময়কে বলা হয় 'দ্য ডেমোনিক আওয়ার'।"
হিমি নিজ অজান্তেই বলে, "ব্ল্যাক ম্যাজিক!"
হিমি কাঁপা হাতে টেক্সট করে, "হাই।"
ক্ষুদ্র লেখক নামের আইডি থেকে রিপ্লাই আসে, "আমি জানতাম হিমি নামে কেউ আমাকে নক করবে। তা আপনিই তাহলে সেই?"
"আমি কি আপনাকে কিছু বলতে পারি?"
"তার আগে বলুন, আপনার হাত কেটেছেন কেন? টিস্যু পেপারের রক্তের ঘ্রাণও পাচ্ছি।"
"ঘ্রাণ পাচ্ছেন কী করে?"
"আমি আপনার ঘরেই আছি।"
"কী বলেন এইগুলা! কোথায় আছেন?"
"আছি! আছি!"
আরও পড়ুন : নীল আকাশের ব্যপ্তি — গভীর ভালোবাসার গল্প
হিমির ইচ্ছে হল ছুটে গিয়ে ঘরের বাতি জ্বালায়। তখনই টেক্সট এলো, "বাতি জ্বালাবার কথা ভাবছেন? ভুলেও এই কাজ করবেন না।"
"ঠিক আছে।"
"আপনি ভয় পাবেন না। ভয় পেলে সব শেষ।"
"আমি ভয় পাচ্ছি না।"
"আপনি কি কিছু জানতে চান?"
"চাই।"
"ঠিক আছে, বলুন।"
"আপনার নাম কী?"
"বাপ্পি। এ এম বাপ্পি।"
"এ এম অর্থ কী?"
"ওটা তো বলা যাবে না। মাই নেম ইজ মাই পাসওয়ার্ড।"
"আচ্ছা, ওরা আমার সাথে এমন করলো কেন?"
"কারা? আপনার বন্ধুরা?"
"জ্বী।"
"মোটিভ আমার কাছেও ক্লিয়ার না। আমার ক্ষমতারও একটা লিমিট আছে। তবে আমি উত্তর খুঁজবো।"
"ধন্যবাদ।"
"হুম।"
"আপনি কী করেন?"
"আমি ব্ল্যাক ম্যাজিশিয়ান।"
"সেটা তো বুঝলাম। এর বাইরে কী করেন?"
"ফ্রিল্যান্সিং।"
"আচ্ছা।"
"এবার আপনার ঘাড়ে একটা নিঃশ্বাস ফেলতে চাই।"
"কেন?"
"আমি যে আপনার ঘরে আছি এটা বিশ্বাস করেননি
তাই।"
"কিভাবে বুঝলেন?"
"আপনার বাম চোখ দেখে।"
সাথে সাথে হিমশীতল হাওয়া বয়ে গেল হিমির ঘাড়ে। সেরাতে আর ঘুম হল না হিমির।
ঘুম না হবার দরুন সকালে অনেক বেলা অবধি ঘুমালো হিমি। ঘুম যখন ভাঙে তখন সে দেখে তার মা তার দিকে মায়ার দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। হাতে এক কাপ চা। চায়ের কাপটা যখন হিমির দিকে বাড়িয়ে দেয়া হল হিমি অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে সেই কাপটা হাতে নিলো। ইরা বললেন, "মা, তোর ঘুম কেমন হল রে?"
"ভালো না মা।"
ইরা হালকা ধমকের সুরে বলেন, "ইচ্ছা করে রাত জাগলে তো এমনই হবে। দেখলাম তো কাল রাত জেগে ফেসবুক চালাচ্ছিলি।"
হিমি লাজুক ভঙ্গিতে হাসলো। কেন জানি এই মুহূর্তে নিজেকে তার সুখী মানুষদের একজন মনে হচ্ছে। এসময় হিমির বাবা ঘরে এসে বললেন, "বহুদিন ঘরের বাইরে যাওয়া হয় না। মনে হয় সেকারণে আমাদের মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে। চল মা, ঘুরে আসি।"
বহুদিন পর সপরিবারে হিমি কোথাও ঘুরতে গেল। একেবারে দেশের বাইরে, কলোরাডো।
ওখানে একদিন হিমি একটা গির্জায় প্রবেশ করে, একা। গির্জায় কর্মরত এক পাদ্রী তাকে দেখে বলেন, "তুমি তো পরীদের মত সুন্দর।"
"থ্যাংকু ফাদার।"
"মা, তোমাকে আমার পছন্দ হয়েছে। এই কার্ডটা রাখো। এখানে আমার কন্ট্যাক্ট নম্বর আছে। যদি কখনও বিপদে পড়ো, আমায় জানিও।"
"কীসের বিপদ ফাদার?"
"তোমার প্রতিটি নিঃশাসেই বিপদের সম্ভাবনা..."
ফাদারকে এসময় বিষণ্ণ দেখায়।
দেশে ফিরেই কিছুদিন বাদে পত্রিকায় একদিন হিমির বাবা একটা রোড এক্সিডেন্টের নিউজ পড়ে ভীষণ হৈ চৈ শুরু করেন। তিনি পত্রিকাটা হিমির কাছে এনে বলেন, "এই দেখো মা, এই ছেলেটা কেন রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে। কানে হেডফোন লাগিয়ে রাস্তায় চলছিলো। তুমিও তো এই কাজ করো। এখন থেকেই সাবধান হও।"
হিমি পত্রিকাটা হাতে নিলো। তার চোখ বিস্ফোরিত হয়ে গেছে। রোড অ্যাক্সিডেন্টের দৃশ্যের ইনসেটে যে হাস্যমুখী ছেলেটির ছবি সে আর কেউ নয়, বাপ্পি। ফেসবুকের কনভার্সেশনে এতদিনে বাপ্পির অনেক ফটো সে ইনবক্সে দেখেছে। চিনতে কোনো অসুবিধাই হচ্ছে না এখন।
হিমি দুপুরবেলা বারান্দায় বসে ছিল। তখন একজন ভিখারী এসে বলে, "মা, তিনদিন না খেয়ে আছি। কিছু দিবেন?"
হিমি ঘর থেকে দশ টাকার একটা নোট এনে দেয়। ভিখারী তবু যায় না, বলে, "আমারে কিছু খাওয়ান আল্লার ওয়াস্তে। তিনদিনের না খাওয়া।"
"আমি তো আজ বাসায় একা, আর আমি তো আপনাকে দশ টাকা দিয়েছি।"
ভিখারী কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে, "আম্মা পারলে টাকা ফিরাইয়ে নেন, তবু কিছু খাইতে দেন।"
এভাবে বললে আর কিছুই বলার থাকে না বরং মায়ায়
লাগে। হিমির বেশ মায়া লাগলো। সে ভিখারীকে সিঁড়িঘরে বসিয়ে রেখে দোতলায় উঠে গেল খাবার আনতে। কিছুক্ষণের মধ্যে খাবার এনে দিতেই ভিখারী খাওয়া শুরু করলো। হিমি ভ্রু কুঁচকে বলল, "বিসমিল্লাহ্ বললেন না?"
ভিখারী এমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকালো যেন ভূত দেখছে। হিমিও কিছুটা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে গেল। ভিখারী এরপর ধীরেসুস্থে খাওয়া শেষ করে বিদায় নিয়ে চলে গেল। হিমি এটো থালাবাসন সব নিজের হাতেই নিয়ে ওপরে উঠে গেল। কিন্তু কে জানতো এমন সাদামাটা বাস্তবতার মাঝে কোনো অবিশ্বাস্য কিছুর কালো ছায়া লেপ্টে আছে?
বসার ঘরে আসতেই হিমি দেখে ভিখারী সোফায় বসে আছে। তাকে দেখে এগিয়ে আসে আর তার হাত ধরে বলে, "খাবার দারুণ ছিল। এই অভুক্তকে আপনি রক্ষা করলেন।"
"কে আপনি?"
তখনই ভিখারীর সমস্ত অবয়ব পাল্টে গিয়ে লম্বা কুদর্শনে পরিণত হল। ভিখারীরূপী আগন্তুকটি বলল, "আমি মানুষ নই। আমি আপনাকে বিপদ থেকে রক্ষা করতে এসেছি। আপনার সামনে মহাবিপদ! আপনার মত ভালো মেয়ে এই বিপদে থাকুক, তা আমি চাই না। সেজন্যই সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও আপনাকে সাবধান করতে এসেছি। আজ থেকে রাতে একা ঘুমাবেন না। ভরদুপুরে একা থাকবেন না। যে আপনার
ক্ষতি করবে তার নাম আমি জানি, কিন্তু বলতে পারবো না।"
"তবু নামটি জানতে চাই।"
"সময় হলে জানবেন। এবার বিদায় দিন।"
হিমি কিছু বলবার আগেই আগন্তুক বিশাল আগুন হয়ে নিমিষেই অদৃশ্য হয়ে গেল।
রাতের বেলা হিমি ঘুমিয়ে পড়েছিল। ডেমোনিক আওয়ারে তার ঘুম ভাঙে। তখন দেখে অন্ধকারেও একজনকে দেখা যাচ্ছে, যে আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে রেখেছে। একটি ঝাপসা অবয়ব, যার পা নেই এবং সে শূন্যে ভেসে আছে। সে-ই হল বাপ্পি। হিমি ভয়ে কম্বলের নিচে মাথা লুকাতেই বাপ্পির একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনতে পায়।
দীর্ঘক্ষণ নীরবতার পর বাপ্পি বলে, "কাল আবার আসব সোনা। জেগে থেকো।"
পরদিন রাতেও ডেমোনিক আওয়ারে ঘুম ভাঙে হিমির। সে চেয়ে দেখে বাপ্পি রাগী চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। বাপ্পি বলে, "তোমাকে কিন্তু জেগে থাকতে বলেছিলাম।"
হিমি বলে, "কী চাও তুমি?"
"তোমাকে। হিমি, আই লভ ইউ!"
"এটা কী করে সম্ভব?"
"মানে?"
"তুমি তো মারা গেছো।"
"ভুল জানো। মারা যাইনি বরং মেরে ফেলা হয়েছে আমায়।"
"আমি এতকিছু জানতে চাই না। একটা কথা শোনো বাপ্পি, মানুষ মারা গেলে কেউ আর তাকে ফিরে পেতে চায় না। সে যত আপনই হোক। এটাই বাস্তব।"
"আমাকে তুমি চাও না?"
"না।"
বাপ্পি কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে থাকে। তারপর জানালার দিকে তাকাতেই জানালার শার্সি স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে যায়। বাপ্পি তখন দাঁড়কাক হয়ে উঁড়ে চলে যায়।
পরদিন রাতে বাপ্পি আর আসেনি। হয়তো সুযোগ পায়নি। কারণ এবার সেই আগন্তুক ভূতটির কথামত হিমি তার মাকে নিয়ে শুয়েছে। সেরাতে আরামের ঘুম হল হিমির। সকালে বেড টি খেতে খেতে সে যখন একটা উপন্যাস পড়ছিল তখনই তার মুঠোফোনে একটা কল আসে। হিমি রিসিভার কানে তুলে নিতেই শোনে, এক অদ্ভুত কন্ঠস্বর তাকে বলছে, "ডোন্ট ট্রাই টু ইন্ট্রডিউসিং ইয়োরসেলফ হোয়েন দ্য ডেভিল হ্যাজ থ্রী শ্যাডোস!"
হিমি 'আজাইরা' বলে ফোন রেখে দেয়, সে গুরুত্ব দেয় না। বিকালে সে যখন তার এক বান্ধবীর বাসার দিকে রওনা দেয় তখনই দেখে এক সুদর্শন ছেলে তার দিকে হাসিমুখে এগিয়ে আসছে।
আরও পড়ুন : অবশ চেতনা — একটি নিঃসঙ্গ মানুষের রহস্য গল্প
ছেলেটি তার সামনে এসে একটি ডায়মন্ডের আংটি দেখিয়ে বলে, "এই আংটিটা মনে হয় আপনার।"
আংটিটা দেখে হিমির মনে পড়ে যেদিন সে বখাটে বন্ধুগুলোর পাল্লায় পড়ে পালিয়ে আসছিলো সেদিন বাড়িতে এসে সে আংটিটা খুঁজে পায় না।
হিমি বলে, "এটা আপনি কোথায় পেয়েছেন?"
"বলবো। তার আগে এক কাপ কফি খেতে চাই আপনার সাথে।"
হিমি হাসিমুখে বলে, "চলুন।"
যাত্রাপথে হঠাৎ হিমির নজর যায় ছেলেটির পায়ের দিকে।
আশ্চর্য ছেলেটির তিনটা ছায়া! হিমির তখন সকালের ফোনটির কথা মনে পড়ে। সে তৎক্ষণাৎ বলে, "আমি বাসায় যাব।"
"কেন?"
হিমি কিছু না বলেই হাঁটা ধরে। তারপর পিছু না তাকিয়েই একটা সিএনজিতে চড়ে বাসায় আসে। সে বুঝতে পারে ছেলেটি বাপ্পি বা বাপ্পির জগতেরই কেউ ছিল।
হিমি মনে মনে ভাবে, ফাদারকে এখন ফোন দেয়া যেতে পারে। ফাদারকে ফোন দিতেই তিনি অমায়িক স্বরে বলেন, "আমি জানি মা তোমার সাথে কী কী ঘটছে। আমি তোমাকে এখান থেকেই প্রোটেক্ট করছি।"
"ফাদার, ঐ ভিখারীরূপী আগন্তুকও কি আপনার পাঠানো?"
ফাদার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেন, "হ্যা। তবে মা, এরপর থেকে যা-ই ঘটুক না কেন তুমি আমায় প্রশ্ন করতে পারবে না।"
"ঠিক আছে ফাদার।"
"আর রাতে ঘুমিও, কেমন?"
একদিন সন্ধ্যায় ফেসবুকিংয়ের সময় হিমি দেখে বাপ্পি তার পাশে বসে। হিমি ভীত কন্ঠে বলে, "কী চাও?"
"আমি তোমাকে আমার জগতে নিতে চাই হিমি।"
"না প্লীজ!"
বাপ্পি ঈষৎ হাসে।
"আচ্ছা, আত্মারা কি ফেসবুক চালায়?"
"কেন উদ্ভট প্রশ্ন করছো?"
"আমি নিজেও জানি না।"
"আমি এখনও ফেসবুক চালাই। আর শোনো, আমি আত্মা নই... ক্বারিন!"
"ক্বারিন কী?"
"অতকিছু ডিস্ক্রাইব করতে পারব না। বাই!"
বাপ্পি চলে যায়। কিন্তু কিছু একটা যেন ফেলে গেছে। হয়তো গুটিকতক দীর্ঘশ্বাস। হিমি কী ভেবে বাপ্পির ফেসবুক প্রোফাইলে ঢোকে। একটা লম্বা পোস্ট সেখানে দেখতে পায় সে। পোস্টটি সে পড়তে থাকে—
(এই লেখাটির সাথে মূল গল্পের কোনো সংযোগ নেই, চাইলে এটুকু স্কিপ করতে পারেন।)
অণুগল্পঃ মাতাল রজনী
চোখ বুজতেই একফোঁটা পানি বের হল মেয়েটির চোখ থেকে। আমি তাকিয়ে আছি দেখে বলল, একটা প্রশ্ন করি?
আমি বলি, না।
“আপনি কি এখান থেকে যেতে পারবেন?”
“হ্যা।”
“তাহলে প্লীজ চলে যান। আমি একটু কাঁদবো।”
আমি চলে যেতে শুরু করেছি, মেয়েটি আবার ডাকলো। বলল, আপনি আমার সাথে কথা বলেন না কেন?”
“বলি তো।”
“প্রশ্ন করলে শুধু উত্তর দেন। তাও আবার 'হ্যা-না' বলে।”
আমি আবারও মেয়েটির দিকে তাকালাম। সে অমায়িক হয়ে বলল, আপনার ভেতরে যদি কোনো কষ্ট থাকে, আমায় বলুন। শুনব।
“আপনি কাঁদুন, আমি পরে আসবো।”
স্লাইডিং ডোরটা খুলে বারান্দায় এলাম। তখনই উড়ে যেতে ইচ্ছে হল। দাঁড়কাক হবো কিনা ভাবছি। গতরাতে অনেকক্ষণ দাঁড়কাক হয়ে আকাশে উড়েছি। তাই আজ বাতাসের কারণে ঠান্ডা লেগেছে। আমার এখনও বিশ্বাস হয় না যে আমি মারা গেছি। অথচ এই মেয়েটি কী দ্রুতই বিশ্বাস করে ফেলেছে! মৃত্যুর পর কোনো এক কারণে নিজের বাড়িতে থাকতে ইচ্ছে হয়নি।
কান্নার শব্দ কানে এলো হঠাৎ। মেয়েটি শব্দ করে কাঁদছে। কেন কাঁদছে জানি না। মৃত্যুর পর মাঝে মাঝে আমি মানুষের মনের কথা পড়তে পারি, মাঝে মাঝে পারি না। মেয়েটির নাম স্নিগ্ধা। প্রথম যেদিন দাঁড়কাক হয়ে উড়ে বারান্দায় বসি তখন সে আমাকে তাড়িয়ে দেয়। এরপর অদৃশ্য হয়ে এসেছি। তখনও ছিল রাত। সে যখন ওড়নাটা ফেলে দিয়ে ড্রেসটা খুলতে যাবে তখনই আমি দৃশ্যমান হয়ে বলি, প্লীজ স্টপ!
সে প্রথমে ভড়কে গেলেও পরে আমার দিকে চোখ বাঁকা করে তাকায়। ঠোঁটে তখন ঈষৎ হাসি ঝুলে থাকে। বলে, ওয়াও! অপূর্ব, চোরেরাও এত্ত স্মার্ট হয়?
“আমাকে একটু আশ্রয় দেবেন?”
“মানে?”
আমি অদৃশ্য হয়ে তার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আবার দৃশ্যমান হয়ে বলি, আমি মারা গেছি। কিভাবে মরেছি সেটা বলতে পারব না। আমার একটা আশ্রয় দরকার। তারপর থেকে স্নিগ্ধার তেতলার বাসায় আছি।
আমি বারান্দা থেকে বলি, স্নিগ্ধা, কান্না শেষ হয়েছে? আমি আসব?
স্নিগ্ধা কঠিনস্বরে বলে, না! আপনি চলে যান! আর কখনই এখানে আসবেন না।
অতঃপর আমি দাঁড়কাক হয়ে উড়ে যাই আকাশে। আজ ঠান্ডাটা বেশি পড়ছে। তবুও বাতাসের বেগে উড়বার চেষ্টা করছি। আরেকটি আশ্রয় খুঁজছি আর ভাবছি আমার যদি দ্বিতীয় মৃত্যু থাকতো...
কেউ না জানলেও হিমি জানে এটা নিছক গল্প নয়, সত্যি!
আরও পড়ুন : যাপন — অচেনা দুঃখের গল্প
পরদিন সন্ধ্যায়..
রাস্তায় পা রাখতেই থমকে যায় হিমি। তার সেই অপহরণকারী বন্ধুরা দাঁড়িয়ে আছে। তারা খুব বাজেভাবে শিষ দিয়ে বলে, "সেদিন তোমাকে কাছে পায়নি, আজ আমরা তোমাকে কাছে পেতে চাই।"
একজন তখন হিমির দিকে এগিয়ে আসে। হিমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায়। কারণ আশেপাশে কেউ নেই। সেইসাথে সন্ধ্যার নিকষ কালো আধার। এমন সময় এগিয়ে আসা ছেলেটির মাথা একশো আশি ডিগ্রী অ্যাঙ্গেলে ঘুরে যায়। ওখানেই সে মৃত্যুবরণ করে পড়ে যায় মুখ থুবড়ে। বাকিরাও একে একে একইভাবে মারা পড়লো। তখনই দৃশ্যমান হল বাপ্পি।
"হিমি তোমার হাত দাও। চলো আমার সাথে।"
হিমি ভয়ের দরুন দাঁড়িয়ে থাকে চুপচাপ।
"হিমি, অনেক ধৈর্য্য ধরেছি! আর পারছি না। চলো আমার সাথে।"
হিমি কিছু না বলেই ছুটতে শুরু করে। তারপর বাড়িতে আসে। নিজের ঘরে এসে কাঁপাহাতে ফোন দেয় ফাদারকে। কিন্তু একী! কেউ ফোন ধরছে না! এসময় আবারও তার সামনে দৃশ্যমান হয় বাপ্পি। বলে, "সরি টু সে ডার্লিং.. ইউর ফাদার ইজ ডেড!"
হিমি চেয়ে থাকে নিশ্চুপ চোখে। বাপ্পি একঝলক হেসে বলে, "আমি আসব.. গভীর রাতে। তোমায় নিয়ে যেতে।"
ডেমোনিক আওয়ার
হিমি জেগে আছে। এখনও আসেনি বাপ্পি অশনি সংকেত হয়ে। হিমি তাকালো টেবিলের দিকে, যেখানে পড়ে আছে ব্লেড। নিজেকে শেষ করে দিতে চায় সে! কিন্তু কোনটা তার জন্য নিয়তি নির্ধারিত? বাপ্পি এসে তার জগতে নিয়ে যাবে নাকি আত্মহত্যায় হবে তার নিয়তি? তবে যেটাই হোক, দুটাই তো মৃত্যু পরবর্তী ব্যাপারই হবে। এই ভেবে হিমি চোখ বুজলো আর তার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়লো দু'ফোটা অশ্রু!
