ছুটির দিনের গল্পে কেউ একজন থাকুক।
পূজা থাকবে না তবু। রবির ভাবনা জুড়ে পূজা। সে থাকবে না তবু। রাতে রবির ফোনে এখন আর টেক্সট আসে না। শেষ টেক্সট মনে করে রবির হাসি পায়। অনবরত ম্যাসেজের পর ম্যাসেজ পেয়ে পূজা বিরক্ত হয়ে রিপ্লাই করেছিলো, রবি তুই মদ খেয়ে মরে যা!
রবি মরে যায়নি। কিন্তু তার মনে হয় পচে গলে যাওয়া ছাড়াও মরা যায়। যে মৃত্যু তাকে স্পর্শ করেছে।
বারান্দার আরাম কেদারায় এখন আর রবির বাবা বসেন না। বারান্দায় বসলে অনেকদূর দেখা যায়। এখন আর রবির বাবা ইন্দ্রনাথ চক্রবর্তী সেই দূর দূরান্ত দেখে তন্ময় হন না। রবিকে নিয়ে তার অনেক চিন্তা। ছেলের ঘরের সামনে পায়চারি করছেন ক্ষণিকের সময় ধরে।
রবি ঘুমে আছে। ঘুমাবার অনুপযুক্ত সময়ই রবির জন্য যথেষ্ট। রাতে সে নিশাচর বাঁদুড়। কী যে করে রাত জেগে! দু'দিন আগে রবির দ্বিতীয় বর্ষের রেজাল্ট বের হল। দ্বিতীয় বর্ষের ইম্প্রুভমেন্ট। যথারীতি এবারও ম্যাথে সে ফেল করেছে। ফাইনাল ইয়ারে বসে ফেল করা মানে আরও একটা বছর গেল। কে তাকায় সেদিকে?
রবির বাবা সকালের নাস্তা না সেরেই রেগেমেগে বেরিয়ে গেলেন।
দৃশ্যটি দেখলেন রবির মা হৃদিতা ব্যানার্জি। রবিকে ডাকতে এসে দেখেন রবি আড়মোড়া ভাঙছে। মায়ের দিকে তাকিয়ে একবার বলল, চা দাও মা।
চা খাওয়ার অভ্যাস থাকলেও সে বেলায় তাকে কেউই পাত্তা দেয় না। আজও পাত্তা পেল না। রবির মায়ের হয়তো তবু একটু মায়া হয়েছিল, তিনি মুখ ঝামটা দিয়ে বললেন, রান্নাঘরে তো পানি গরমই আছে, নিজে বানিয়ে নে।
"প্রতিদিন তোমরা আমায় এমন করে কথা শোনাও কেন মা?"
"প্রতিদিন কোথায় কথা শুনিস? তুই তো দিনের বেলা ঘুমেই থাকিস।"
"আজ আর ঘুমুবো না। দাও, চা দাও।"
রবির মা চা নিয়ে এসে দেখেন রবি বই নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। বিরস মুখে পাতা উল্টাচ্ছে আর বলছে, মা, আমি খুব অলস!
"এই নে চা।"
"ও! এনেছো? দাও।"
"চা খেয়ে একটু বাইরে থেকে ঘুরে আয় দেখি। তোর বাবা কোনদিক গেল, এখনো এলো না।"
"বাবা আর যাবে কোথায়, মহল্লার মোড়ে চায়ের দোকানে বসে আমার নামে হা-হুতাশ করছে নিশ্চয়ই।"
"সে তো জানিই। তুই বাবা যা তাড়াতাড়ি। নিয়ে আয় বাসায়। ছুটির দিনে তার মেজাজ ঠিক থাকে না।"
রবির বাবা যে চায়ের দোকানে আছেন সে ধারণা মিথ্যা প্রমাণিত হল — রবি চায়ের দোকানে তার বাবার বন্ধুদের পেল কিন্তু তার বাবাকে নয়। রবি দোকানদারকে কিছু জিজ্ঞাসা করবার আগেই সুধীর বাবু নামের ভদ্রলোক বললেন, ও রবি, তোমাকে একটা কথা বলার ছিল বাবা।
"বলুন কাকা!"
রবির কন্ঠে বিষাদ৷ সাথে শঙ্কা। সে যা আন্দাজ করছে সুধীর কাকা যদি তাই জিজ্ঞেস করে তবে ব্যাপারটা অতি লজ্জাজনক হয়ে দাঁড়াবে।
আরও পড়ুন : দ্বিতীয় জীবন – নতুন জীবনের বাস্তব গল্প
"এসো, এদিকে এসো!"
আড়ালে নিয়ে কথা বলার ভঙ্গি দেখেই বোঝা গেল রবির ধারণায় সত্য। ভদ্রলোক প্রথম প্রথম পড়ালেখার খবর নিলেন। তারপর আর কোনো প্রসঙ্গ না পেয়েই হয়তো সরাসরি মূল কথায় ঢুকলেন। বললেন, বাবা, আমার মেয়ে পূজাকে তোমার কি খুব পছন্দ?
রবি বলে, কাকা, আমি আসি।
"তোমাকে প্রশ্ন করেছি উত্তর দাও। অভদ্রের মত চলে যাবে কেন?"
"কাকা আমি ওকে খুব ভালবাসি।"
"তোমার বাবা কিন্তু খুব ভাল মানুষ। তাই ব্যাপারটা এখনও কনসিডার করছি। তুমি আর ঝামেলা বাড়িও না।"
"পূজাও আমাকে ভালবাসে কাকা।"
লোকটি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন বলে মনে হল। তিনি এতটা স্পর্ধা আশা করেননি। রবি তবু সংকোচের মাঝ দিয়ে গেল না। ব্যাপারটা যেহেতু গড়িয়ে গেছে, আরও গড়াক।
রবি বলে, পূজাকে বলেছিলাম আমায় বিয়ে করতে। পূজা সেটা শোনেনি। আমি ফোর্স করায় আমার সম্পর্কে আপনাকে সব বলে দিয়েছে।
ভদ্রলোক হা করে তাকিয়ে আছেন।
"আমি পূজার ভালো চাই কাকা। ও মহল্লার বখা ছেলে সুজনের প্রেমে পড়েছে। আমি চাই না পূজা জেনেবুঝে এমনটা করুক।"
"সুজন নামের বেয়াদবকে আমি দেখব। তুমি এরমধ্যে থেকো না।"
"জ্বী আচ্ছা।"
"আর শোনো, তোমার বাবাকে বলবে আমার সাথে দেখা করতে।"
"কেন কাকা? সব তো মিটমাট হয়েই গেল। আমি তো আপনাকে এইমাত্র আশ্বাস দিলাম আমি পূজার জীবন থেকে সরে যাব।"
"আমি যা বলেছি তাই হবে। আজই তোমার বাবাকে পাঠিয়ে দিও।"
রবি তার বাবাকে কিছুই বলল না। সোজা চলে গেল পূজার কাছে৷ পূজা তার কলেজের গেটে দাঁড়িয়ে ফুচকা খাচ্ছিল। আচমকা রবি তাকে বলে, এমন করলে কেন?
পূজা জবাব দিলো না। তার বান্ধবী পাশ থেকে ফিসফিস করে কিছু বলতেই পূজা হেসে ওঠে৷ রবি বলে, ভগবানের দিব্যি রইলো, আমি তোমায় ভালবাসি।
আরও পড়ুন : প্রীতি — নিঃসঙ্গ মেয়ের দুঃখের গল্প
পূজা একবার তাকালো। ঐ চোখে আজ মায়া নেই। তবু রবি আকর্ষণ অনুভব করে। রবির নিষ্পাপ ভালবাসার চাহনি দেখে পূজার বান্ধবী তাচ্ছিল্য করে বলে, আপনি অনার্সে থাকতে থাকতেই আমার ইন্টারে পড়া বান্ধবী সুজনকে বিয়ে করে নিবে।
এটা বলে সে চোখ দিয়ে ইশারা করলো। সুজন অদূরেই ছিল, রবি ইশারা অনুসরণ করে সুজনকে দেখলো। পূজা বলল, আজ বিকালে ফ্রি আছি। জরুরি কথা থাকলে বলতে এসো।
এটা বলেই পূজা রবির সামনে দিয়ে সুজনের বাইকে উঠে চলে গেল। কিছু শুকনো পাতার মর্মর ধ্বনি তুলে ওরা যেন সাইলেন্সারে অনধিক ধোয়া বার করে উড়ে গেল।
সুজন আর পূজা এখন বাওড় এলাকার টিলার ওপর দাঁড়িয়ে। একটা সিগারেট ধরিয়ে দুজনে মিলে টানছে। সুজন বলে, ঐ মরাটা তোকে আবারও বিরক্ত করছিল?
"করলেই বা কি?"
"আমার ওকে সহ্য হয় না৷ শুধু তোর অনুমতির অভাবে ওকে মারতে পারি না।"
"মেরে লাভ নেই। ও পিছু ছাড়ার ছেলে না।"
"আরে অপমান তো হবে। বয়সে আমার চেয়ে ঢের বড়। মার খেলে অপমানে জীবন চিনতে শুরু করবে।"
"হাহাহা!"
"তুই ওকে ভালবাসিস..। আমি জানি।"
"ভালবাসলে ক্ষতি কী?"
সুজন খিস্তির মত কিছু একটা বলতে গিয়ে বলল না। পিচ করে থুথু ফেলল একদলা। পূজা গাইতে শুরু করলো,
'ম্যায় ইশক হ্যায় উছকা
ও আশিকি হ্যায় মেরি
ও লাড়কা নেহি জিন্দেগী হ্যায় মেরি!'
রবি নিখোঁজ।
তাকে কোথাও না পেয়ে রবির বাবা বিরক্তি নিয়ে ঘরে বসে আছেন। রবির মা এসে বলেন, ছেলেটা তোমায় খুঁজতে গিয়ে নিজেই নিখোঁজ। আসুক বাসায়!
"আহ, সবসময় অতো তেতে থাকো কেন? অসুরটার ওপর তো আমারও রাগ আছে। অন্তত তুমি রাগ দেখিও না।"
"তাই? ছেলের জন্য এত দরদ আজ!"
"দরদ না, আমারও রাগ হচ্ছে। কান্ড বাধিয়েছে সে।"
"কী কান্ড?"
"সুধীরের মেয়েকে কুপ্রস্তাব দিয়েছে।"
"কী!"
"না না, আমার রাগ অন্যখানে। সুধীর একটা চতুর লোক। সে ইচ্ছা করেই মিথ্যে বলছে। আসলে কুপ্রস্তাব নয়, ওরা একে-অপরকে ভালবাসে।"
"তুমি বুঝলে কী করে?"
"আমার ছেলে আর বুঝব না?"
কিছুক্ষণ চুপ থেকে রবির মা একটা চিরকুট এনে রবির বাবার হাতে দেয়। রবির বাবা বলেন, কী এটা?
আরও পড়ুন : হারিয়ে যেও না — অর্বাচীন প্রেমের গল্প
"আমাকে তুমি যতটা বোকা ভাবো আমি ততটা বোকা আদৌ নই। এটা পড়ো।"
রবির বাবা চিরকুটটি মেললেন –
'পূজা, আজ তোকে আমি ভোগ করতে চাই!'
রবির বাবা হতভম্ব আর ব্যথিত হয়ে তাকালেন। রবির মা কাঁদো কাঁদো হয়ে বলেন, আমাদের ছেলেটা অমানুষই হয়েছে বুঝলে!
"এটা পেলে কোথায়?"
"ওর বন্ধুকে দিয়েছিল পূজার কাছে দিয়ে আসতে। মাঝখান থেকে বন্ধুটিকে আমি ধরে ফেলেছি।"
"হা ভগবান! এ ছেলের ভবিষ্যৎ আর কী?"
রবি নিজেও জানে না তার ভবিষ্যৎ। এই মুহূর্তে তো নয়ই। আজ বৃহস্পতিবার। গত দু'দিন হল তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। অবেলায় সে একটা জায়গায় স্থির হয়ে বসলো। সূর্যটা তখন মধ্যগগনে। তার চারপাশে ফসলের ক্ষেত, মহল্লা ছেড়ে দু'কিলো দূরের পথ এটি। পথের প্রান্তরে সে বসে আছে।
পূজাকে ফোন করেছিল। পূজা তাকে অবাক করে 'আসছি' বলেছে। পূজা এলে তাকে আজ কিছুই বলা হবে না। অথচ কত ভালবাসার কথা তার মনে ছিল। আজ আর কিছুই বলতে গিয়ে মনে পড়ছে না।
পূজা এলো।
বসলো ঠিক রবির পাশে। পূজা বলল, আমি তোর মত অতটা ভালবাসতে জানি না। তবু আমি তোকেই ভালবাসতে চাই।
"তুই পারবি না..।"
"কেন?"
রবি অপরাধীর মত মুখ ফিরিয়ে নিলো। পূজা বলে, আমার দিকে তাকা।
রবি তাকালো। তার চোখে আহত মানুষের দৃষ্টি।
"আমি তোর চোখ পড়তে পারছি। তুই আমায় কামনার চোখে দেখছিস।"
রবি তৎক্ষণাৎ আবার মুখ ফিরিয়ে নিলো। পূজা বলল, আমি তবু তোকে ভালবাসি।
"বাসিস না পূজা!"
"তুই আমায় কামনা করছিস, কিন্তু এই নির্জনে আমাকে স্পর্শও করিসনি।"
রবি আশান্বিত হয়ে তাকালো।
"তোরা ছেলেরা আমাদের মেয়েদের কতটুকু চিনিস? অথচ আমি তো জানি শত কষ্ট হলেও তুই নিজেকে দমন করতে জানিস। অন্যের চোখে তুই অমানুষ, কাপুরুষ। কিন্তু আমার চোখে…"
পূজা কথা শেষ করে না। রবি হা করে পূজার দিকে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ রবিকে পূজার বাচ্চা ছেলে বলে ভ্রম হয়।
নিষ্পাপ বাচ্চা ছেলে!
