দ্বিতীয় জীবন – নতুন জীবনের বাস্তব গল্প

সারা সপ্তাহ উড়িয়ে সময় গুনতে বসা ছেলে আবির। হা হুতাশ করে দম নেয়, তারপর আদা জল খেয়ে লেগে পড়ার আশ্বাস খোঁজে। চাকরি করার ইচ্ছে নেই। দু'বছর তবু চাকরি করার অভিজ্ঞতা ওর আছে। বেসরকারি ব্যাংকের ক্যাশ সেকশনের চাকরি। এই দু'বছরের মাঝে তার প্রমোশন হবার কথাও ছিল। শাখা ম্যানেজারের আশ্বাসে সে অনেকটাই আশান্বিত হলেও শেষমেশ ক্যাশের বাইরে ডেস্কে বসলো অন্য কেউ। 

আবির কিছুটা হৈচৈ বাধাবার চেষ্টায় ছিল। কিন্তু কেউ তেমন সাড়া দিলো না। ওদিকে অফিসের অন্য এক শাখার ম্যানেজার তাকে ডেকে অনেকক্ষণ নিচুগলায় কথা বললেন। সবই সাবলীল সামাজিক আলাপ –

“কেমন আছেন?”

“বাসায় আপনার কে কে আছেন?”

“বয়স তো কম হল না, বিয়ে করেছেন নাকি?”

আবির খুচরা আলাপের মানে কিছুই বুঝলো না। শেষে বেরুবার ক্ষণে ম্যানেজার বললেন, বিয়ে না করে ভালোই করেছেন।

সে অবাক হয়ে বলে, কেন স্যার?

ম্যানেজার কিছু বলেন না। তিনি ইতস্তত হয়ে নকল কাশি দেন। আবির তখনই আশংকা করে তার চাকরি নিয়ে সমস্যা হয়েছে। 

সমস্যা হবারই কথা, তার চাকরির অবস্থায় যে ছিল টেম্পোরারি। 

ঢাকাতে একটা রুম সাবলেট নিয়ে তাকে থাকতে হয়। চাকরি যাবার পর মাস দুয়েক গ্রামের বাড়িতে ছিল সে। মা-বাবা বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাকে আবার ঢাকায় ফেরত পাঠালেন চাকরির চেষ্টার জন্য। বাবা বললেন, তোর তো পোস্ট গ্র‍্যাজুয়েট, সব কয়টায় ফার্স্ট ক্লাস ডিভিশন। চিন্তা কি? লেগে থাকলে ভালো ভালো চাকরির খোঁজ পাবি!

আবির কখনও তার বাবার মুখের ওপর কথা বলে না। তবু সে বলল, আমি এবার নিজে উদ্যোগ নিয়ে কিছু করতে চাই। বেশি না… আমাকে বিশ হাজার টাকা দিলেই হবে। 

আবিরের এ কথায় তার বাবা কর্নপাত করলেন না। বললেন, সময় নষ্ট হচ্ছে। সময় নষ্ট না করে ঢাকায় ফিরে যা। টাইম ইজ মানি! 

সময় যে অর্থের সমতুল্য তা আবির জানে। 

আর অর্থ মাত্রই সুযোগ তৈরি করে দেয়। অর্থ, সুযোগ সবই তাকে নিজে অর্জন করতে হবে। সাবলেট রুমের লম্বা মেঝে সে হেঁটে হেঁটে পার হল। বাইরে এলো চা গিলতে। সকালের সূর্যের গগনবিদারি নীরব চিৎকার রোদ হয়ে ভেসে আসছে। সেই রোদে গা ভিজিয়ে চা না খেলে পৌষ আর মাঘের শীত তার শীতই মনে হয় না। 

চা দিতে বলে সে। 

ওদিকে একটু চিপা গলিতে প্রেমিক যুগল দেখা যায়। তার ইচ্ছে হল ঘুরে বসে। তার দরকার হল না, চিপা গলির দৃশ্যের মুখে আচমকা কেউ একজন এসে তার পাশে বসে। 

আবির মেকি হেসে বলে, আরে স্যার আপনি? কেমন আছেন? 

আবির এখনও সেই ম্যানেজারকে দেখেই চিনে ফেলল। নিজাম উদ্দিন নামের এই ম্যানেজারই তাকে তার ডেস্কে ডেকে খুচরা আলাপ জুড়েছিল। আজও তাকে ইতস্তত দেখাচ্ছে৷ কারণ কি?

“স্যার, ভালো আছেন?”

“হ্যা?”

যেন তিনি সাংঘাতিক রকম চমকালেন। তারপর সম্বিৎ ফিরে পাওয়া ভঙ্গিতে বলেন, হ্যা ভালো আছি।

আরও পড়ুন : প্রীতি — নিঃসঙ্গ মেয়ের দুঃখের গল্প

“স্যার, চা খাবেন নাকি? এই… স্যারকে চা দাও।”

নিজাম সাহেব স্মিত হেসে বলেন, কি করছেন এখন?

“কিছুই না৷”

“ও। ইয়ে.. আপনাকে একটা কথা বলার ছিল।”

আবিরের ভুরু কুঞ্চিত হল। এই লোকটাকে সে কয়েকদিন ধরে প্রায়ই দেখছে। এই রাস্তার মোড়ে তাদের সরাসরি দেখাও হয়ে যায়। তখন তিনি খুব অপ্রস্তুতবোধ করেন। রহস্য কি? 

নিজাম সাহেব বলেন, আপনার চাকরি যে পারমানেন্ট ছিল এটা জানেন? 

হেসে দিলো আবির। বলে, এটা আবার কেমন কথা।

“হাসার কথা নয় রে ভাই। আপনাকে নিয়ে সামান্য পলিটিক্স করা হয়েছে। আমরা তিন ম্যানেজারের ভেতর সেজো ম্যানেজারের ভাতিজা যখন চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে তখনই আপনাকে বুঝ দেয়া হল আপনার চাকরি টেম্পোরারি। তারপর ঝোপ বুঝে সেজো সাহেব কোপটা দিলেন।”

আবির হা হয়ে গেল। তার রাগ আসছে, কিন্তু নিজাম সাহেবের সামনে রাগ দেখাবার ইচ্ছা আপাতত নেই। হয়তো তিনি কোনো উপকার করতে পারেন। নিজাম সাহেব বলেন, আমি সেই অরিজিনাল পারমানেন্ট চাকরির ফাইলটা এনেছি। আপনি শুধু এটা নিয়ে গিয়ে অফিসে আমার সাথে দেখা করবেন।

আবির সাথে সাথে ফাইলটা হাতে নিলো না। তার মন বলছে এই লোকটা মানবতার খাতিরে এমনটা করছে না। শুধু শুধু মানবতার জন্য এই যুগে কেউ এগিয়ে আসে না। মানবতার জন্য ফেসবুকের স্ট্যাটাস যথেষ্ট। তাতে অনেক সিম্প্যাথি কুড়ানো যায়। 

সে কিছু না বলেই চায়ের দাম দিয়ে উঠে গেল।

নিজাম সাহেব বলেন, ভাই, কই যান? 

আবির তাকালো, নিজাম সাহেবও তাকিয়ে। তিনি বেশ অবাক। আবির চলে গেলেও তার অবাক ভাব কাটে না। মনে মনে সে বলে, পাগল নাকি লোকটা! 

ফ্ল্যাটে ফেরার মুখে বাড়িওয়ালার কমবয়সী বউয়ের মুখোমুখি হয়ে গেল সে। এই মেয়েটি আবিরকে দেখে কখনও সংকুচিত বোধ করে না, যেমনটি অন্যদের বেলায় করে। আবিরের চেহারা সুন্দর। কিন্তু তার থাকা-খাওয়া-পরা তো সুন্দর না। এই মেয়ের মতলব তাহলে কি? মেয়েটি তার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে চলে গেল। 

আবির বিরক্ত হল। প্রতিবারই হয়। সে রুমে এসে বিছানায় বসলো। তারপর হঠাৎ শুয়ে পড়লো ঘুমের জন্য। কিন্তু অন্যদিনের মত দরজায় তালা দিয়ে ঘুমালো না। তার রুমমেট চাকরিজীবি মানুষ। ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে সে ভেতরে ঢুকতে পারে। 

কতক্ষণ ঘুমিয়েছে আবির জানে না। 

ঘুম ভাঙলো ডাকাডাকির শব্দে। 

“এই, উঠুন। উফ, কি ঘুম!”

আরও পড়ুন : হারিয়ে যেও না — অর্বাচীন প্রেমের গল্প

আবির উঠে বসে দেখে বাড়িওয়ালার স্ত্রী দাঁড়িয়ে। তার পরনের সাজপোশাক এখন ইউরোপীয়দের মত যথেষ্টই উগ্রো। পরনের জামা ছোট এবং টাইট। নগ্ন পেটে নাভির ওপর উঠে আছে জিন্সের শর্টস।

মেয়েটি বলে, তুমি আমার নাম জানো?

“আপনি আমাকে তুমি করে বলছেন কেন?”

মেয়েটি বিরক্ত হয়ে বলে, সময় নষ্ট আমার পছন্দ না। আশ্চর্য! রূপকথার মত মেয়েটি আবিরের শরীরে লেপ্টে গেল। তারপর.. অতঃপর তারা একে-অপরকে গভীর বন্ধনে জুড়ে নিলো। 

সবটা কি কল্পনা ছিল? 

মেয়েটি চলে যাবার পরও তার ঘোর কাটে না। রাতে রুমমেটের সাথে ডালভাত মেখে খেতে গিয়ে অনেক কথা হল। রুমমেট রাফাত ভাই বয়সে আবিরের ছোট। প্রচুর বই পড়েন অফিসের চাপ নিয়েও। বেশিরভাগই থ্রিলার। রাফাত বলে, ভাই, ১৯৮৪ বইটা পড়ে দেখুন। জানি আপনি থ্রিলার ধাচ পড়েননি। তবু ভালো লাগবে। 

“আচ্ছা, তাই নাকি?”

“জ্বী। জর্জ অরওয়েল যে শুধু লেখকই না, মস্ত গবেষকও তা বুঝতে পারবেন।”

“কিভাবে?”

“ডিস্টোপিয়ান বিশ্বকে উনি যেভাবে ডিস্ক্রাইব করেছেন তা বলে বোঝাবার বাইরে। বর্তমান বিশ্বের অনেককিছুই মিলে যায়।”

আবির ভাত শেষে অবশিষ্ট ডালে চুমুক দিয়ে বলে, আমাদের জগতটা ভয়াবহভাবে ডিস্টোপিয়ার মত সংকটাপন্ন হবার মাঝে দায়ী কারা?

“এটা তো ভেবে দেখিনি!”

“লাইফে অপশন বেড়ে গেলে ইমোশন কমে যায়। আর পশ্চিমা সভ্যতা এটাকেই ইস্যু করে নিয়েছে। কারণ ওরা জানে মানুষ সব ফিল্ডের জন্য একসাথে পারফেক্ট নয়। সে যেকোনো একটা ফিল্ডেই শুধু ফোকাস রাখতে সক্ষম।”

“তাই নাকি?”

“আপনাদের আলবার্ট আইনস্টাইন তো তেমনই বলেছেন, যে ব্যক্তি গাড়ি চালাতে চালাতে গার্লফ্রেন্ডকে কিস করে তার মনোযোগ আসলে কিস করার মাঝে নেই। এখন শুনুন, আমাদের ফোকাসটা মূল জ্ঞানের থেকে কেড়ে নিয়ে একটা তুচ্ছ বিষয়ের ওপর রাখা হচ্ছে। আর সেই তুচ্ছ বিষয়ের নাম টাকা। আমরা টাকার ওপর এতটাই ফোকাসড যে বহির্বিশ্বের এন্ট্রোপি নিয়ে মাথা ঘামাতে চাইলেও পারি না। কারণ আর্নিং ইস্যুকে অনেক হার্ড করে তারা এটাকে সুযোগ বানিয়ে নিয়েছে।”

আরও পড়ুন : নিঃশব্দের প্রয়োজনে — ভিন্ন প্রেমের গল্প

রাফাত কিছুক্ষণ চেয়ে রইলো। সে এই লোকের সাথে সাবলেট আছে ছ'মাস। এই ছ’মাসে লোকটার সম্পর্কে তেমন কিছুই জানা হয়নি। রাফাত বলে, আপনার পড়ালেখা কতদূর? 

“আমি অনার্স পাস৷ অনার্স ফাইনালে পাঁচটা সাবজেক্ট ফেইল করে আবার পরীক্ষা দিয়েছি। কিন্তু বাড়িতে নকল সার্টিফিকেট দেখিয়ে ঠিকই পোস্ট গ্র‍্যাজুয়েট হয়ে আছি। হাহাহা!”

রাফাত কিছু বলল না, সে বিস্মিত। এই লোক এত সুন্দর করে একটা বিষয় ব্যাখ্যা করলো। অথচ সে গ্র‍্যাজুয়েশন কমপ্লিট করে নাই – কোনো মানে হয়? 

সত্যিই কোনো মানে হয় না। 

আবির জানে, আবিরকে জানতে হয়েছে যে এ দেশে পড়ালেখা করে কিছু হয় না। সকাল এলে তাই তাকে রাফাতের মত ব্যস্ত হতে দেখা যায় না। দেখা যায় কেবল টং এর দোকানে চা খেতে। আজ সকালে যেমন দেখা যাচ্ছে। 

“চা হইতে দেরি হইবো ভাই। পেপার লন, ততক্ষণ একটু পড়েন।”

আবির পত্রিকা হাতে নিলো। প্রথম পাতার হেডলাইনটুকু দেখেই ভেতরে ঢুকলো যখন তখনই একটা খবরে চোখ আটকে গেল –

‘চাকরি ফিরে না পাওয়ায় যুবকের হাতে ম্যানেজার খু/ন’

ইনসেটে মৃ/ত ম্যানেজারের পাসপোর্ট সাইজ ছবি। ম্যানেজারটি নিজাম সাহেব। আবিরের মাথাটা চক্কর দিয়ে ওঠে পুরো খবরটি পড়ার পর। রহস্য ঘনীভূত, তবু পড়ে মনে হল এক ম্যানেজারের রাগ আরেক ম্যানেজারের ওপর ছিল। মাঝখান থেকে একজন সাধারণ যুবককে ভি/ক্টি/ম করে দোষী বানানো হয়েছে। 

গতদিন তো নিজাম সাহেব এসেছিলেন, চাকরি ফিরে পাবার চেষ্টা করতে বলেছিলেন। তাহলে এটাই প্রমাণ হল, নিজাম সাহেবকে দিয়ে আবিরকে ও নিজাম সাহেবকে তারা ভি/ক্টি/ম বানাতে চাইছিলো, যারা এই হ/ত্যা/য/জ্ঞ করেছে। কী ভ/য়ং/ক/র!

আবির চা না খেয়েই উঠে গেল। 

নিজের ঘরে এসে দেখে বাড়িওয়ালার স্ত্রী মেয়েটি দাঁড়িয়ে। আজও তার পরনের পোশাক উগ্র। তবে আবির আজ তাকে পাত্তা না দিয়ে দ্রুত আলমারির দিকে গেল। তারপর নিজের বস্ত্র গুছিয়ে নিতে শুরু করলো ব্যাগে। 

মেয়েটি বলে, কি হয়েছে? 

আবির তার বোধোদয়ের ঘোর থেকে বলে, আমি জীবন থেকে বঞ্চিত নই, যেমনটি আমি এতদিন ভাবতাম। আমার জীবনে সব আছে, ছিলাম না শুধু আমার মাঝে আমি।

“পাগল নাকি?”

“তোমাদের শহরটা বড় বেশি নোং/রা, তোমরা বড় বেশি ভ/ন্ড! তাই তোমরা আমার মত সাধারণ মানুষকে চিনবে না।”

মেয়েটি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। 

তার অবাক চোখকে অগ্রাহ্য করে বেরিয়ে পড়লো আবির। বাসে উঠতেই রাফাতের ফোন, ভাই, আপনাকে দেখলাম ব্যাগপত্র নিয়ে বাসে উঠতে… 

রাফাতের কথা শেষ হবার আগেই আবির বলে, আমি ফিরে যাচ্ছি আমার শেকড়ে। যেখানে আমার বাবা-মা এবং আমার আমি রয়েছি। 

Previous Post Next Post