প্রীতি — নিঃসঙ্গ মেয়ের দুঃখের গল্প

সে এক অবলীলার প্রসঙ্গ, তবুও প্রীতি সংকোচের দরুন প্রসঙ্গ এড়িয়ে যায়। সাবের তখনও দক্ষিণের জানালার ধারে দাঁড়িয়ে। কিছুটা দ্বিধা মিশ্রিত ভয় নিয়ে প্রীতি জিজ্ঞেস করে, আমি তবে আসি? 

ঘুরে তাকায় সাবের৷ তার টানটান মুখশ্রীতে বয়সের কোনো ছাপ নেই। তবু কেন নিষ্প্রাণ তার ঐ দুটি চোখ? 

"কফি খেয়ে যাও।"

"আজ থাক।"

"বাসায় জরুরি কাজ ফেলে এসেছো?"

প্রীতি কড়া চোখে তাকালো। এই মুহূর্তে এই লোকটিকে তার ভীষণ নিষ্ঠুর মনে হচ্ছে। লোকটা সত্যিই হয়তো নিষ্ঠুর। নয়তো চাকরির সুযোগ নিয়ে একটা মেয়েকে বারবার রুমে ডেকে ব্যক্তিগত আলাপ জুড়ে দেবার কোনো মানে নেই। সে বলল, অফিসের কাজ শেষ তাই বাসায় যেতে চাইছি। 

"তোমাকে যেতে দিতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু ছেড়ে দিলে তো তুমি মুক্ত পাখি হয়ে যাবে।"

প্রীতির আচমকা চমকে ওঠার শিহরণ উপভোগ করলো সাবের। অল্প হেসে বলে, নতুন এক হাসপাতালে নার্স হিসেবে জয়েন করেছো, এখন আমাকে কোম্প্যানি দেবার জব থেকে তুমি মুক্ত। তাই না?

প্রীতি চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, আমার কাজ আপনাকে কোম্প্যানি দেয়া নয়। কারণ আমি আপনার পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট নই, আমি রিসিপশনিস্ট। 

সাবের আহত চোখে তাকালো। বলল, তুমি তাহলে সত্যিই চলে যাচ্ছ?

"হ্যা!"

"আমি যে তোমায় ভালবেসেছি এটা কি জানো?"

প্রশ্নটা যেন নাগালের বাইরে ঘুরছে। অথচ প্রীতি এই প্রসঙ্গেই কথা শুরু করতে চাইছিল। লোকটা তাকে ভালবাসে, এটা প্রীতির বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু তাদের একে-অপরের পারিপার্শ্বিক অবস্থা তাকে হতাশায় ফেলে দেয়। কোথায় সে, কোথায় সাবের। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির সদ্য সিইও সাবের। সমাজের বাইরেও এদের প্রভাব থাকে, থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে কি প্রীতির মত মেয়ে কেনা পুতুল হয়ে যাবে? তারও তো স্বকীয়তা বজায় রাখার প্রশ্ন আছে। 

প্রীতি জবাব না দিয়ে উঠে পড়লো। সাবের পিছন থেকে বলে, একটু দাঁড়াও!

প্রীতি দাঁড়াতেই দেখলো সাবেরের হাতে বিয়ের কার্ড। সে হাসিমুখে এগিয়ে এসে বলল, বোকা মেয়ে। তোমার বস বলে কি অফিসের বাইরে আমাদের দুজনার কোনো জীবন নেই? অবশ্যই আছে! সেই জীবনবোধ থেকেই রসিকতা করলাম।

 আরও পড়ুন : হারিয়ে যেও না — অর্বাচীন প্রেমের গল্প

প্রীতি কিছু বলল না, তবে তার অন্তরাত্মা কাঁপলো। লজ্জায় কোথায় যেন সে মিশে যেতে থাকলো। 

"চলো, তোমায় ড্রপ করে দিই।"

"দরকার হবে না স্যার।"

"কাঁদছো নাকি?"

প্রীতির চোখ সত্যিই ছলছল করছিল, তবু সে মাথা নাড়লো। একরকম ছুটে বেরিয়ে গেল রুম থেকে। করিডোর ধরে হাঁটতে গিয়ে সবকিছু সে ঝাপসা দেখতে লাগলো। নিজেকে তার খুব ছোট মনে হচ্ছে। সব বড়লোকেরাই কি এমন? গরীবদের পার্সোনালিটি নিয়ে খেলা করা কি তাদের ন্যাচার? প্রীতি জানে না। হয়তো প্রীতিদের এ সকল প্রশ্নের উত্তর জানা নিষেধ। তবু তাদের কল্পনায় একজন সুপুরুষ আঁকা থাকে, যে সর্বদা শালীন ভালবাসার আবেগে জড়িয়ে রাখবে। মেঘ করলেই মাথার ওপর ভরসা হবে, রৌদ্রপ্রহরে নীল আকাশের মত ব্যপ্তি নিয়ে অনুভূতির দ্বারে বিশালতা মেলে ধরবে। ভাবতে ভাবতে প্রীতি রাস্তায় নেমেছে। আকাশে দারুণ মেঘ। তবু তার ভেতর কোনো তাড়া নেই। বৃষ্টির প্রারম্ভ ক্ষণে সে বাসস্টপ এড়িয়ে হেঁটে চলেছে। লোকজন তাকে অবাক হয়ে দেখছে। প্রীতি সে সমস্ত খেয়াল করেও নির্বিকার। তার মন শুধু বলছে, আমার ভেতরটা যদি কেউ পড়তে পারতো! 

Previous Post Next Post