উদাস হয়ে গিয়েছিলাম।
একটু লাজুক চাহনির মেয়েটি কী বলে যেন চলে গেল। আমি অজান্তেই 'আচ্ছা' বলার পর হাতে একটা চকচকে নোটের স্পর্শ অনুভব করলাম। চেয়ে দেখি টেবিলে বিলের খসড়ায় আরও হাজারটা টাকা। আমার হাতের পাঁচশো টাকাটা আসলে বখশিশ। এরকমটি নতুন নয়, মেয়েটি প্রায়ই আসছে। প্রায়ই এক্সট্রা কিছু না কিছু টাকা হাতে দিয়ে চলে যাচ্ছে। লজ্জার মাথা খেয়ে সেসব হাতের মুঠোয় গিলছি, আর ক্লান্ত শ্বাসে বলছি, আর কত?
আমি টাকা মানিব্যাগে গুজে আবার উদাস হলাম। আমার চোখ বাইরের গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির দিকে। রেস্টুরেন্ট আজকের মত ক্লোজ। রাত অনেক হয়েছে। অথচ কেন জানি বাসায় ফিরতে ইচ্ছে করছে না। টেবিলও পরিষ্কার করছি ধীরে। তেমন কোনো উচ্ছিষ্টও নেই টেবিলে।
বিলটা হাতে নিয়ে টেবিল হতে প্রস্থান করতে গিয়ে টাকা ছাড়াও একটা স্লিপের মত লেখা পেলাম। ভুরু কুঁচকে দাঁড়িয়ে সেটা মেলে দেখি লেখা — 'আমার চোখের দিকে তাকাও না কেন? আমি কি একাই তাকিয়ে থাকব তোমার দিকে?' সদ্য কলেজ ওঠা টিনএজ মেয়েটির স্লিপ আমি আমার মানিব্যাগে গুজলাম। আহসান স্যার তখন ডাকলেন। আমি অবাক হয়ে তার কামরায় ঢুকি। অবাক না হয়ে উপায় কি, আহসান স্যার বাসায় চলে গিয়েছিলেন। আবার কখন ফিরলেন? তিনি ডাকলেন, বাপ্পি!
আমি বলি, জ্বী স্যার।
"কী খবর তোমার? সারাক্ষণ তো কাজ নিয়েই আছো দেখছি। মাঝে মাঝে কামরায় আসো।"
আরও পড়ুন : যাপন — অচেনা দুঃখের গল্প
আমি আপ্লুত হলাম। হাসিমুখ করে দাঁড়িয়ে রইলাম, কিন্তু কিছু বললাম না। স্যারের আন্তরিকতা সবসময় আমাকে আপ্লুত করে। তিনি বললেন আবার, পড়াশোনা কেমন চলছে?
"জ্বী স্যার ভালো।"
"অনার্সের কোন ইয়ার এবার?"
"জ্বী থার্ড।"
"বসো। দাঁড়িয়ে আছো কেন?"
আমি বসতেই যাচ্ছিলাম, সত্যি বলতে খুব ক্লান্ত লাগছিল। স্যার তৎক্ষনাৎ অপ্রস্তুত হলেন। বললেন, বসো না। তোমাকে আসলে একটা জরুরি কাজে পাঠানো দরকার।
"জ্বী বলুন স্যার।"
স্যার তার টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটা খাম বার করলেন। বললেন, এটা আমার বাসায় দিয়ে এসো। আর শোনো, পারলে আবার এখানে এসো। আমি এখানেই আছি।
আমি কিছুই বুঝলাম না। বিস্ময় গোপন করে খাম হাতে নিলাম। তবে এটুকু বুঝেছি স্যারের সাথে তার স্ত্রীর মনোমালিন্য হয়েছে। যার দরুন তিনি আজ সারারাত এখানেই থাকবেন৷ বাসার ঠিকানা নিয়ে অতঃপর আমি বের হলাম।
বৃষ্টি তখনও গুড়ি গুড়ি পড়ে চলেছে। বাইক স্টার্ট দিয়ে চলতে শুরু করেছি। আর ভাবছি রেস্টুরেন্টে আসা মেয়েটির কথা। ওর নাম তূর্ণা, বান্ধবীরা এই নামেই ডাকছিলো। সত্যিই কি সে স্লিপের কথা অনুযায়ী আমার দিকে তাকিয়ে থাকে? কিন্তু আমি যে ভালবাসতে অপারগ। একজনকে ভালবেসেছিলাম, তার স্মৃতিই এখন বৃষ্টিতে আমায় উদাসীন হাওয়ায় নস্টালজিক করে তোলে।
আমি আজও তাকে ভুলিনি, কিন্তু সবসময়ই ভুলতে চেয়েছি। কারণ সে হঠাৎ আমায় ভুলে চলে গিয়েছিল। সে পারলে আমি কেন পারিনি? উত্তরের অনুসন্ধান করেও আমি আজ প্রশ্নবিদ্ধ।
ঠিকানা অনুযায়ী পুরনো ঢাকার এক গলিতে ঢুকে সাদা একটা বাড়ির দরজায় কলিংবেল চাপলাম। দরজা খুললো স্যারের স্ত্রী। আমাকে দেখে সে বলল, তোমাকে আমি ভেতরে আসতে বলব না। যা বলার এখানেই বলো।
আমার ভেতরটা তবু জানতে চাইছিল, কেমন আছো?
কিন্তু ইমা নিশ্চয়ই সে সুযোগ দেবে না। শুধু মনে হচ্ছে পৃথিবীটা এত ছোট কেন? কেন এখানে আমার প্রাক্তনকেই থাকতে হলো?
খামটা ওর হাতে দিয়ে চলে আসছিলাম। আচমকা মায়ার টানে পিছু ফিরে তাকালাম। আশ্চর্য, সে তখনও চোখে অবজ্ঞা মিশিয়ে তাকিয়ে আছে। আর বলল, জানো, এ খামে কী আছে?
"না।"
"আমার ডিভোর্স লেটার।"
আরও পড়ুন : নীল আকাশের ব্যপ্তি — গভীর ভালোবাসার গল্প
এরকম পরিস্থিতিতে পড়ে যাব ভাবিনি। ইমার চোখে পানি দেখে অধিকারের আভাস পেলাম, তাই ওর দিকে এগুলাম। বললাম, কী হয়েছে ইমা?
"ভেতরে এসো। বলছি। ইস, বাচ্চাদের মত কী বিশ্রীভাবেই না ভিজেছো!"
আমি ভেতরে গেলাম। ঘরে বসে আছি, আমাকে দারুণ লজ্জায় ফেলে ইমা নিজ হাতে তার টাওয়েলে আমার মাথা মুছে দিচ্ছে। সে বলল, তুমি জানতে চাও, তাই না?
আমি বলি, হ্যা।
"জানলে তোমার মন খারাপ হবে।"
"কেন?"
"এসব ভেবে লাভ নেই। তবে প্লীজ তুমি কাঁদবে না। আমার কথা শুনে যেমনি এসেছিলে, তেমনিই চলে যাবে।"
আমি তাকিয়ে রইলাম। আমার জবাব দিতে কেন জানি সময় লাগলো। কিছু কথা আমাদের কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে তোলে।
আমি বাইকে চেপে চলে যাচ্ছি। আমার চোখ ভিজে যাচ্ছে। অথচ আমি কাঁদতে চাইছি না, তবুও। আসবার সময় ইমা জিজ্ঞেস করেছিল, কাউকে ভালবেসেছো?
আমি জবাব দিইনি। তখনও জবাব দিতে পারিনি, যখন সে বলল, আমি কি মারা যাচ্ছি?
কিন্তু ইমা সত্যিই মারা যাচ্ছে। তবু কি শান্ত স্বরেই বলল, আমার আসলে ডিভোর্সটা প্রয়োজন ছিল। অনেকদিন ধরেই একা হতে চাইছিলাম। আজ সুযোগ হল।
এরপর সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বলে, আমি আসলে বাচ্চাদের একটা রোগ বাধিয়ে বসেছি। আমার শরীরে নতুন নতুন রক্ত নিতে হয়। লিউকেমিয়া নামের এ মরণব্যাধি রোগ থেকে বাঁচার কোনো আশা নেই।
তারপর সে আবার চুপ। এরইমাঝে কখন উঠে গেল টেরই পেলাম না। ফিরলো একটা ক্যামেরা হাতে নিয়ে। আমার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে ভুরু কুঁচকে বলে, তোমার চেহারা রুক্ষ হয়ে গেছে। দাঁড়াও, আমি ব্যবস্থা করছি। ইমা ক্যামেরার লেন্সে হাল্কা জেল লাগিয়ে নিলো। এতে নাকি ছবি কোমল হবে। সে শুধু আমার ছবিই তুললো। দুজন একসাথে ছবি তুলতে চাইলে সে কঠিন গলায় বলল, আমি তো আর থাকব না। আমার জন্য মায়া বাড়িও না!
আহসান স্যারের সাথে পরে আর দেখা করিনি। রেস্টুরেন্টের চাকরিটাও ছেড়ে দিয়েছি। পুরনো ঢাকায় ইমা আর থাকে না। আমি ইমাকে প্রায়ই খুঁজি, কোথাও পাই না। বিশাল এ শহরে সে তার অভিমান ছড়িয়ে কেবলই নিখোঁজ। আমার মন বলেছিল আমায়, আমি কি পারতাম না সেরাতে ইমার দায়িত্ব নিতে? কিন্তু আমার কঠিন সত্তা জবাব দিয়েছে, ইমাও একসময় প্রয়োজন দেখে আমায় ছেড়ে গেছে। মানুষের প্রয়োজনে তাই না বলা উচিত, যাতে সে আমার গুরুত্ব বুঝতে পারে।
