নীল আকাশের ব্যপ্তি — গভীর ভালোবাসার গল্প

সকালটা এভাবে শুরু হবে ভাবিনি। মেঝেতে ভাঙা কাপের টুকরোগুলো আমি পরিষ্কার করতে যাচ্ছিলাম, আমার স্ত্রী সেটা দেখে তড়িঘড়ি করে নিজেই হাত লাগালো। মৃদু স্বরে বলল, আপনি বারান্দায় বসুন। আমি এক্ষুনি চা নিয়ে আসছি। দেরি হবে না।

একটু আগেই স্ত্রী নীলিমাকে বলেছিলাম, কুসুম গরম চা আমি খেতে পারি না।

বলেই আর অপেক্ষা করিনি, মেঝেতে কাপ ছুড়ে ফেলেছি। নীলিমার কথা অনুযায়ী বারান্দায় যেতে গিয়ে দেখি মায়ের ঘরে বিছানার ওপর কুরআন রাখা। আমাকে চা দিয়েই নীলিমা প্রতিদিন কুরআন তেলওয়াত করে — মনে পড়লো। 

“আপনার চা,” নীলিমা পাশে দাঁড়িয়ে আছে, চা নিলে সে বলল, আমি আসলে গরম চা-ই বানিয়েছিলাম। বাবার চা'টা ছিল কুসুম গরম। আপনি ভুলে বাবারটা নিয়েছিলেন। 

আমি লজ্জায় জবুথবু হয়ে গেলাম। আমাকে লজ্জিত দেখে সে বলল, আমারই দোষ, আপনার চা আগে বানালেই পারতাম। 

নীলিমা যেমন নীরবে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল, তেমনি নীরবে মায়ের ঘরে ঢুকলো। আমার মা গত হয়েছেন দু'মাস হল। কয়েকমাস আগে মা খুব তাড়াহুড়া করলেন আমার বিয়ের জন্য। বললেন, ও আমান, তোর কেমন মেয়ে পছন্দ? 

আমি বললাম, তুমি যেমন চাও, তেমনই। 

তারপর মা নীলিমার সাথে বিয়ের বন্দোবস্ত করলেন। সাধারণ চেহারার মেয়ে নীলিমা, চেহারার কৃষ্ণবর্ণ প্রথম চোখে পড়ে। উচ্চতা খুব কম নয়, তবে আমি প্রায় ছ'ফুট হওয়ায় তাকে অনেক কম উচ্চতার মনে হয়। বাসর রাত হতে আজ অবধি আমি কোনোদিন তার দিকে সরাসরি তাকাইনি।

আমার কাছে নীলিমা কেমন তা এটুকুতেই হয়তো প্রকাশ পায়। তবু বলব তাকে আমি ভালোবাসা ও ঘৃণা কোনোটার মাঝেই রাখিনি। খুব সংক্ষেপে, তাকে নিয়ে কখনো ভাবিইনি কিছু। কিন্তু তার শান্তশিষ্ট কন্ঠস্বর আর কথা বলার মাঝে নিজের ব্যক্তিত্ব বজায় রাখার কৌশল আমাকে অনেক মূগ্ধ করে। 

বারান্দার ইজিচেয়ারে বসলাম আমি। হাতলে হাত রাখতেই কেন জানি মনে হল, হাতলটা অনেক বেশি চকচকে দেখাচ্ছে। নীলিমাকে কোনোদিন বারান্দায় দেখিনি, তবু ইজিচেয়ার সবসময় পরিষ্কার থাকে। কই, বিয়ের আগে তো এমন ছিল না! তারমানে নীলিমা নিজেই ইজিচেয়ার পরিষ্কার করে। আবিষ্কার করলাম — সামান্য ইজিচেয়ারে বসলেও আমি নীলিমার কথা ভাবতে বাধ্য। অথচ তাকে আমি স্ত্রী হিসেবেই সেভাবে ট্রিট করিনি কোনোদিন। 

চা শেষ করে আবার নিজের ঘরে এলাম। আমার বিয়েটা কি খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল? ভাবলাম আমি। মা বলতেন প্রায়ই আমার জন্য সুন্দরী এক মেয়েকে মনে মনে ঠিক করে রেখেছেন। আমি মূলত সেটা শুনেই প্রলোভন বোধ করি। সুন্দরী সেই মেয়েটিকে আমার থেকে মা লুকিয়েও রাখেননি, একদিন তিনি আমায় মেয়েটির ছবি দেখিয়েছিলেন। কিন্তু নীলিমা আর ছবির মেয়ে এক নয়। 

আরও কঠিন সত্য হল, বিয়ের দিনই আমি বুঝতে পারি মা যার ছবি দেখিয়েছিলেন নীলিমা তারই ছোটবোন। মেয়েটির নাম ছিল সাফা। আমার তখন সদ্য পাওয়া এক প্রাইভেট সেক্টরের ছোটখাটো জব। সাফা আমার জব সম্পর্কে জানার পর বিয়েতে না করে দেয়। এদিকে সব কথা পাকা হয়ে যাবার পর সাফার বাবা-মা আর পেছাতে চাননি। অতঃপর তারা গোপনে আমার সাথে নীলিমার বিয়ে দেন। 

আরও পড়ুন : দ্য ডেমোনিক আওয়ার — ভয়ংকর ভুতের গল্প

আমি আজও অপমান, লজ্জা আর ক্রোধ অনুভব করি। 

নীলিমা ঘরের দরজার সামনে এসে বলল, আপনাকে একটা কথা বলবার ছিল। 

আমি বললাম, এসো, ভেতরে এসে বলো।

নীলিমা ভেতরে এলো, ওকে এত ক্লান্ত দেখাচ্ছে কেন? আমি জিজ্ঞেস করলাম, মন খারাপ? 

সে অবাক হলেও নিমিষেই নিজেকে সামলে বলল, না।

আমি তার অবাক হওয়া দেখে মনে মনে মায়া অনুভব করি — আহা, এই মেয়েটি আমার থেকে এতটুকু সৌজন্যও আশা করতে পারেনি। 

“আপনি কি আমাদের বাসায় একবার যাবেন? বাবা-মাকে অনেকদিন দেখিনি।”

“নিশ্চয়ই যাব। আমারই উচিত ছিল আরও আগে তোমায় নিয়ে যাওয়া। আচ্ছা নীলিমা, অনেকদিন তো হল.. তুমি এবার আমায় ‘তুমি’ ডাকলেই পারো।”

“আমি চেষ্টা করব,” সে লাজুক হয়ে জবাব দিলো।

বিকেল দিকে আমরা রওনা হলাম, শ্বশুরবাড়ি আমাদের এই রাজধানী শহরেই — আদাবর এলাকায়। হঠাৎ এসেছি দেখে শ্বশুর-শাশুড়ি খুবই অপ্রস্তুত হলেন বলে মনে হল। আমি ব্যাপারটা সহজ করতে হেসে বললাম, আপনারা ব্যস্ত হবেন না। দিন তো পড়েই রইলো, আবার যখন আসব জমিয়ে আয়োজন করবেন। 

শ্বশুর সাহেব বললেন, তা হলেও প্রথমবার যে এলে বাবা.. একটু তো আয়োজন করায় লাগে। 

নীলিমা এসেছে শুনে সাফা আনন্দে খুবই উত্তেজিত। সে এসে আমার সামনেই বোনকে আহ্লাদে জড়িয়ে ধরে বলল, আমাদের তো ভুলেই গেছিস।

নীলিমাকেও অনেক হাসি-খুশি দেখাচ্ছিল। কিন্তু ভাবতে খারাপ লাগলো, আমাদের বাড়িতে ওকে এরকম হাস্যোজ্জ্বল কখনও রাখতে পারিনি।

রাতে খাবার টেবিলে একটা বিষয় জানা গেল — সাফার বিয়ে হচ্ছে অতি শীঘ্রই। এই বিষয়টি শ্বশুর সাহেব নিজে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অনেক আগেই, তবে আজ জানালেন। টেবিলে সবাই খুশি হলেও সাফা মলিন মুখে বসে রইলো। ভাবলাম লজ্জা পাচ্ছে। 

কিন্তু বিষয়টা ছিল ভিন্ন, এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই সাফার অন্যত্র পালিয়ে বিয়ের খবর কানে এলো। 

যাই হোক, এ ঘটনা নিয়ে নীলিমার সাথে আমার কখনও কথায় হয়নি। কিন্তু কে জানতো এর সাথে আমার নিজেরও যোগসূত্র থাকতে পারে?

সেদিন ছিল সোমবার। আমি অফিসে বসে আছি, ক্রস চেকিংয়ের হিসাব নিয়ে হেড ক্যাশিয়ার হাজির হয়ে বললেন, স্যার, আপনার কি ডায়াবেটিস আছে?

আমি অবাক হয়ে বললাম, মানে?

“অফিসে আমরা সবাই মিষ্টি খেলাম, একমাত্র আপনি বাদে.. তাই…”

“মিষ্টি? কীসের মিষ্টি?”

ক্যাশিয়ার সাহেব নিজেও অবাক হয়ে বললেন, অফিসের বস বিয়ে করেছেন, কোন এক ফাজিল জেনে গিয়ে সারা অফিসে ছড়িয়ে দিয়েছে। বস বাদ্ধ হয়েই সবাইকে মিষ্টি বিতরণ করছেন।

আরও পড়ুন : অবশ চেতনা — একটি নিঃসঙ্গ মানুষের রহস্য গল্প

আমি তো খবর শুনে নিজেই নিজেকে বোকা ঠাওরালাম। এই খবর আমি জানি না কেন? অথচ বসের সাথে আমার খুব বন্ধুত্ব। অফিসের বাইরে আমাদের প্রায়ই দেখা সাক্ষাৎ আর আড্ডা হয়। 

ঐদিন সন্ধ্যায় প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছিলো, অনেকেই অফিস ক্যান্টিনে আটকে গেল। বসকেও দেখলাম একপাশে দাঁড়িয়ে বিরক্ত হয়ে সিগারেট টানছেন। আমাকে দেখে হাত ইশারায় ডাকলেন। কাছে গিয়ে জানলাম, তার গাড়ির কার্বুরেটরে সমস্যা হওয়ায় দুপুরে তার স্ত্রী এসে গাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন গ্যারেজে, এখনও ফিরেননি। আমি তার পাশে দাঁড়াবার কিছুক্ষণ বাদেই বসের স্ত্রী এলেন। 

আর মেয়েটি অচেনা কেউ ছিল না, ছিল — সাফা। 

খুবই অপমানের ব্যাপার, সাফা আমার দিকে ফিরে তাকানোরও চেষ্টা করলো না। এমনকি তার আচরণ দেখে আমিও তাদের মাঝে আলাপ করবার ভরসা পাইনি। বস সৌজন্যতার খাতিরে আমাকে দু-একটা কথা বললেও সাফা তার আচরণকে সহজ করলো না। আমাকে স্তম্ভিত রেখেই দুজনে চলে গেল। আমি কিন্তু দাঁড়িয়েই রইলাম, বৃষ্টি না থামা অবধি। 

ডিনারে হঠাৎ বাবার খাওয়া শেষ হয়ে গেলে নীলিমা নিজেই বলল, আজ সাফা আপুর সাথে তোমার দেখা হয়েছে, না? আপু বলছিল।

আমি কিছু না বলে ডালের বাটিটা টেনে নিই।

“আপু আসলে লজ্জায় কথা বলেনি, তোমার বিয়ের আগের ঘটনায় সে এখনও লজ্জিত।”

“এসব কথা থাক।”

“তুমি কি রাগ করেছো?”

“এসব নিয়ে ভাবিনি।”

নীলিমা দেখলাম অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে তাকিয়ে। আমি বললাম, আমার চিন্তাভাবনার ধরনটা একটু আলাদা। আর আমি খুব বেশি বিষয় নিয়ে ভাবিও না।

“আমার মত।”

আমি অবাক হয়ে তাকালাম। দেখলাম, নীলিমার ঠোঁটের কোণে হাসি। তারচেয়েও বড় কথা তার দৃষ্টি আমার দিকেই। সেসময় আমার মনে হল, এরকম মেয়েই হয়তো সারাজীবন খুঁজে এসেছি।

তখন থেকেই নীলিমার সাথে আমার অনেক কথা হতে শুরু করলো। আর খুব দ্রুতই আমাদের সম্পর্ক স্বামী-স্ত্রীর মত হয়ে উঠলো। আমাদের ভালোবাসা, রাগ, অভিমান সবই ছিল। শুধু একটা জিনিস নিয়েই আমাদের দুঃখ ছিল — আমাদের সন্তান ছিল না। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী জানা গেল, কখনও সন্তান হবার সম্ভাবনাও নেই। দোষটা আমারই ছিল। আমার স্পার্ম কাউন্টের সমস্যা ছিল। 

নীলিমা এক রাতে আমায় জাগ্রত দেখে শক্ত করে হাত ধরে বলে, আমি আছি তো! 

আর আমার মনে হল, সেই মুহূর্তে সেই আশ্বাস না পেলে আমি আরও অবসাদে জড়িয়ে যেতাম। কিন্তু শ্বশুরবাড়িতে আমার অবস্থান এমনিতেই বিশেষ কিছু ছিল না, এ ঘটনার পর নীলিমার বাবা-মা আরও নিষ্প্রতিভ হলেন আমার প্রতি। নীলিমাকে দেখলাম একদিন মন খারাপ করে বসে আছে। আমি জিজ্ঞেস করলে বলে, বাবা-মাকে অনেকদিন দেখি না.. বাড়ি যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সাফা আপুও আসবে বাড়িতে। 

আরও পড়ুন : যাপন — অচেনা দুঃখের গল্প

আমি বুঝলাম না, বললাম, অসুবিধা কী? দুই বোন আবার এক বাড়িতে —

আমার কথা শেষ করতে দেয় না নীলিমা, বিরক্ত হয়ে বলে, তুমি বুঝতে পারছো না। ওখানে গেলে আমাদের স্টোররুমে থাকতে দেবে। 

আমি তবু রসিকতা করে বলি, যে যেটা ডিজার্ভ করে, তার সেটাই তো দেয়া উচিত।

নীলিমা তৎক্ষণাৎ আমার মুখটা হাত দিয়ে চেপে ধরে। আর বলে, তুমি অতুলনীয়। অন্তত আমার কাছে। আর আমি চাই না আমার সামনে তোমায় কেউ অপমান করুক। 

“তুমি তাহলে কী চাও?”

“চলো না, আমরা দূরে কোথাও ঘুরে আসি। আমরা দুজন থাকব শুধুই।”

নীলিমার কথা আমি রেখেছিলাম। সিলেটের জাফলং বেড়াতে যাব বলে ডিসিশন নিই দুজনে। রিসোর্ট ভাড়া থেকে শুরু করে রিজার্ভেশন প্রাইভেট কার — একটু বেশিই খরচ পড়ে যাচ্ছিল। নীলিমা আমাকে এত খরচ করতে নিষেধ করবে ভেবে ওকে সবিস্তরে কিছুই জানাইনি। আমি হাসিমুখে বললাম, বছরে একবারই তো যাচ্ছি। তাও আবার তোমায় নিয়ে। চলো, তোমাকে সারপ্রাইজড করি!

যাত্রার দিনে শুরু থেকেই আমি খুব এক্সাইটেড ছিলাম। বারবার মনে হচ্ছিলো নীলিমার জন্য আমি আজ খুব আনন্দিত। আমার জীবনের মূল কেন্দ্রবিন্দুই সে। মাকে হারিয়ে আমি যেন খুব বেশিই কষ্টে ছিলাম। সৃষ্টিকর্তা নিজে সে কষ্ট দূর করেছেন। 

প্রাইভেট কারে উঠে নীলিমা কেঁদে ফেললো। আমি ওর হাত ধরতেই সে নিজ থেকে আমার হাত আরও শক্ত করে ধরলো। আমি কানে কানে বললাম, ড্রাইভার দেখছে কিনা কে জানে? 

সে তৎক্ষণাৎ হাত ছাড়িয়ে নিয়ে স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করলো। হেসে ফেললাম তখন আমি। 

গাড়ি চলছে। আমরা অনেকটা পথ পেরিয়ে গেছি। পথিমধ্যে নীলিমা প্রায়ই বলছিল, ঘুম পাচ্ছে। 

দেখতে দেখতে সে ঘুমিয়েও গেল। আমার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমুচ্ছে সে। 

আসলে মেয়েটা ক্লান্ত। শুরুতে আমায় বুঝতে বুঝতে ক্লান্ত হয়েছে — তখন অগোচরে তার ক্লান্তির ব্যত্যয় ঘটেছে তার স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। আর যখন আমি নিজে তাকে বুঝতে শুরু করলাম, আবিষ্কার করলাম সে নীল আকাশের মত গভীর। আকাশের সৌন্দর্য সবাই উপভোগ করলেও, আকাশের গভীরতা কেউ বুঝতে পারে না। 

এত চাপা স্বভাবের মেয়েটা — মায়ায় পড়ে গেছি অনেক! আমি চোখ মুছে দেখি তার ঘুম ভেঙে গেছে। 

সে ইশারায় জানতে চাইলো, কী হয়েছে? 

আমি মাথা নাড়লাম।

নীলিমা হেসে বলল, পাগল!

আমি আপন মনে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আর বুঝলাম, আকাশের ব্যপ্তি জানা যায় না বলেই আকাশের সৌন্দর্য আরও বেড়ে যায়!

Previous Post Next Post